পদ্মার তীররক্ষা বাঁধের ৫০ মিটার বিলীন, ঝুঁকিতে সুরেশ্বর মাছের আড়ত

নিজস্ব সংবাদদাতা, শরীয়তপুর

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মা নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের ৫০ মিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে সুরেশ্বর মাছের আড়ত। ইতোমধ্যে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধে এই ধস নামে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নদীতে পানি কমতে থাকায় কিছু স্থানে তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে। এ কারণে তীর রক্ষা বাঁধে এই ধস দেখা দিয়েছে।’  

তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছি আমরা।’

পাউবো সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে নড়িয়া উপজেলার পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীররক্ষা বাঁধের ৩৫ মিটার অংশে ফাটল দেখা দেয়। এর দুদিনের মাথায় গতরাতে বাঁধের ৫০ মিটার অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

বাঁধের ধসে যাওয়া এই অংশের পাশেই রয়েছে সুরেশ্বর মাছঘাট, যা স্থানীয়দের কাছে বড়বাজার নামে পরিচিত।

পদ্মা তীররক্ষা বাঁধে ভাঙনে ঝুঁকির মুখে সুরেশ্বর মাছ বাজার। ছবি: স্টার

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭০ বছর আগে সুরেশ্বর এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে মাছ বেচাকেনা শুরু করেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। এরপর সেখানে গড়ে ওঠে এই বড়বাজার। বাঁধে ধস নামায় এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বাজারটি।

ফাটল দেখা দেওয়ার পরই অনেকেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে শুরু করেন।

বাজার সূত্রে জানা যায়, ভাঙন থেকে বাঁচতে গত দুই দিনে অন্তত ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান।

গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর গ্রামের জেলে মো. কবির হোসেন (৪৩) ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘১৫ বছর বয়স থেকে পদ্মায় মাছ ধরি। বেশিরভাগ সময় সুরেশ্বর ঘাটে এসে মাছ বিক্রি করি। এই ঘাট থেকে কখনো মাছ বিক্রি না করে ফেরত যেতে হয়নি। আজ শুক্রবার ভোরে এসে দেখি বাজারের কাছে অনেকটা জায়গা ভেঙে নদীতে চলে গেছে।’

পদ্মার ডান তীররক্ষা বাঁধে ভাঙন। ছবি: স্টার

তিনি আরও বলেন, ‘এই বাজার ও ঘাট ভেঙে গেলে বিপদে পড়বো আমরা জেলেরা। মাছ বিক্রির জন্য আমাদের আর কোনো সুবিধাজনক জায়গা থাকবে না।’

স্থানীয় সূত্র মতে, পদ্মার টাটকা মাছের জন্য জনপ্রিয় এই সুরেশ্বর মাছ বাজারটি। এ বাজারে অন্তত ৪০টি মাছের আড়ত রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি বরফ বিক্রি ও পাঁচটি মাছ ধরার বিভিন্ন মালামাল বিক্রির দোকানও রয়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, প্রতিদিন ভোরে এই বাজারে মাছ নিয়ে আসেন তারা। সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।

মাছ ব্যবসায়ী সজীব মাহমুদ (৪০) বলেন, ‘এই ঘাটে আমাদের বাপ-দাদার ৪০ বছরের মাছের ব্যবসা। আমি নিজেও ১০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। প্রতিদিন অন্তত ২০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করি। আজ সকালে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে ফেলতে হয়েছে। খুব আতঙ্কে আছি—কখন না আবার পুরো বাজারটি ভেঙে নদীতে চলে যায়।’

পদ্মার ডান তীররক্ষা বাঁধে ভাঙন। ছবি: স্টার

বাজারটি ভেঙে গেলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও জানান তিনি।

জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামকে পদ্মার ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে ২০১৮ সালে ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পাউবো। ২০২৩ সালে বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। খরচ হয়েছে এক হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। সুরেশ্বর মাছ বাজারটি বাঁধের শেষ অংশে অবস্থিত।

পাউবো জানায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে সুরেশ্বর এলাকায় নদীর বিভিন্ন অংশে গভীরতা বেড়েছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাঁধের কাছাকাছি নদীর তীরবর্তী অংশে গভীরতা ছিল ১০ থেকে ২২ মিটার। যদিও অন্য সময়ে এই গভীরতা থাকে ৩ থেকে ৭ মিটার।

বুধবার সর্বশেষ সমীক্ষায় দেখা গেছে, নদীর গভীরতা বেড়ে ১৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

গভীরতা বাড়ার কারণে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানান পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন। শুষ্ক মৌসুমে বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।