গাজীপুরে গ্যাস সংকট: ঘরে-বাইরে বিপাকে শ্রমিকেরা
গাজীপুরে তীব্র গ্যাস সংকটে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় রান্নার সময় গ্যাস না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কারখানার শ্রমিকেরা।
অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। এতে শ্রমিকদের আয়ও কমেছে। আবার ঘরে ঠিকঠাক গ্যাস না থাকায় রান্না করতে হচ্ছে গভীর রাত কিংবা ভোরে।
আর গ্যাস একেবারেই না থাকলে অনেকেই সকালে না খেয়েই কাজে যাচ্ছেন। বিকল্প হিসেবে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে গিয়েও পড়তে হচ্ছে নতুন সংকটে।
আজ সোমবার সকালে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার কুনিয়া শ্রমিক কলোনিতে গিয়ে গ্যাস সংকটের চিত্র চোখে পড়ে।
সারিবদ্ধ ২২টি কক্ষের এই কলোনির রান্নাঘরে অনেককে গ্যাসের পরিবর্তে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে দেখা যায়। কাউকে কাউকে আবার দেখা যায় গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকতে।
কলোনির দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্গিস আক্তার (৪৫) বলেন, ‘সকালে গ্যাস নেই, দুপুরে নেই, রাতেও ঠিকমতো থাকে না। শ্রমিকেরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। নিভু নিভু আগুনে রান্না করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারা দিন কারখানায় কাজ করে রাতে এসে কেউ খেয়ে কেউ না খেয়েই ঘুমিয়ে যান। বাইরের খাবার খেয়ে তো সবসময় চলা যায় না। আগে এত সমস্যা ছিল না।’
একই কলোনির রান্নাঘরে লাকড়ি দিয়ে রান্না করছিলেন অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নিলয়। তিনি বলেন, ‘মাকে সাহায্য করতে লাকড়ি দিয়ে রান্না করছি। কিন্তু এখন লাকড়িও সহজে পাওয়া যায় না। কিনতে বাজারে যেতে হয়, অতিরিক্ত যাতায়াত খরচও হয়।’
শ্রমিক সাথী বেগম (৩৫) বলেন, ‘চিড়া, রুটি আর কলা খেয়ে দিন কাটছে। একটি ডিজাইন পোশাক কারখানায় চাকরি করতাম। কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিন মাস ধরে বেকার। অনেক খুঁজেও নতুন চাকরি পাচ্ছি না।’
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে অবস্থিত ছোট দেওয়া গ্রামের বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের মেয়ে আকলিমা (৫০) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় গ্যাস সংযোগ নেই। সিলিন্ডারের গ্যাসও ছিল না। মেয়ে না খেয়েই কারখানায় কাজে গেছে।’
একই এলাকার বাঁশতলা গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম (৫৫) বলেন, ‘আমি আগে পোশাক কারখানায় চাকরি করতাম। চাকরি ছেড়ে এখন মুদি দোকান চালাচ্ছি। রাতে, কখনো রাত ২টা–৩টার দিকে গ্যাস এলে তখন উঠে রান্না করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দিন সকালে না খেয়েই কাজে যেতে হয়। সন্তানদের জন্যও সময়মতো খাবার রান্না করা যায় না।’
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র জেলা সভাপতি শ্রমিক নেতা জিয়াউল কবীর খোকন বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শ্রমিকদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপ-মহাপরিদর্শক এম এম মামুন অর রশিদ বলেন, ‘গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অন্তত সাত থেকে আটটি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ আমাকে জানিয়েছে।’
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গাজীপুরের গ্যাস সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তা মির্জা শাহনেওয়াজ লতিফ বলেন, ‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর—সব এলাকাতেই গ্যাসের নেট প্রেসার নিচে নামিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নেই।’
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের গাজীপুর অফিসের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘গাজীপুরে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ আছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অতিরিক্ত লো-প্রেশারের কারণে শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিকসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।’