এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও এখনই কাটছে না সংকট

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালই আবার চালু হয়েছে। এতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সংকট এখনই কাটছে না। আগামী অন্তত এক সপ্তাহ দুই টার্মিনালের মোট সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হতে পারে। ফলে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি থেকেই যাবে, যার প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়।

মহেশখালীর টার্মিনাল দুটি চালু করায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮০ থেকে ২ হাজার ৪৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতে পারে। অথচ দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ থাকবে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না।

এই সপ্তাহে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হতে পারে। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৫০০ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এর বড় একটা অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে জ্বালানির সংকটও বড় কারণ।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের গতকালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৮২টি হয় বন্ধ ছিল, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। এর কারণ ছিল জ্বালানি সংকট অথবা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ।

গতকাল শনিবারও পরিস্থিতি বেশ খারাপ ছিল। রাত ৯টা পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। তখন চাহিদা ছিল ১৭ হাজার মেগাওয়াট।

বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।

১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে সক্ষমতার তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—পায়রা, রামপাল ও আরএনপিএল পটুয়াখালী প্রতিটিই এখন মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

আরএনপিএল পটুয়াখালীর উৎপাদন কয়লার সমস্যার কারণে কমে গেছে। আর পায়রা ও রামপালের একটি করে ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে গত ২৮ জুলাই থেকে যান্ত্রিক সমস্যা চলছে। ৯ আগস্ট সেটি আবার চালু করার চেষ্টা করা হলেও সফল হয়নি।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের উৎপাদনও ১০ আগস্ট মধ্যরাতের দিকে কমে যায় বলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য থেকে জানা গেছে।

গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক সমস্যার কারণে এলএনজি সরবরাহ অনেক কমে গিয়েছিল। এখন মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালই আবার চালু হয়েছে।

সামিটের টার্মিনাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আবার এলএনজি সরবরাহ শুরু করে। এর এক দিন আগে সেখানে এলএনজি শেষ হয়ে গিয়েছিল। গতকাল টার্মিনালটি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে, যা এর প্রায় পুরো সক্ষমতার কাছাকাছি।

এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালটিও গতকাল ভোরে আবার চালু হয়। তবে এটি এখন অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। সর্বোচ্চ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। ৬ আগস্ট আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই একই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করছে টার্মিনালটি।

২১ জুলাইয়ের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার মেরামতের কাজ বুধবার পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার পর টার্মিনালটি ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রেখে পরীক্ষা ও সংযোগের কাজ করা হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটটি আবার চালু করা যাবে।

তবে ওই ৭২ ঘণ্টার জন্য টার্মিনালটি ঠিক কবে বন্ধ করা হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি কবে আবার পুরো ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতায় ফিরবে, সেটিও বলা যাচ্ছে না।

এ কারণে দুটি এলএনজি টার্মিনালই চালু থাকলেও আগামী কয়েক দিন মোট এলএনজি সরবরাহ ৭৫০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দুটি টার্মিনালের মোট এলএনজি গ্যাসীকরণের সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গত কয়েক দিনের তুলনায় এটা অবশ্যই কিছুটা উন্নতি। কারণ কয়েক দিন আগে সামিটের এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। একই সময়ে এক্সিলারেটের টার্মিনালও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল।

তবে এতে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা আগের সীমিত অবস্থায়ও পুরোপুরি ফিরছে না।

সাম্প্রতিক সমস্যার আগে দেশে প্রতিদিন সাধারণত প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। অথচ চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাসের এই সংকটের প্রভাব এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় পড়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানাগুলো কম সক্ষমতায় চলছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে এবং সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।