বাড়ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি, পর্যাপ্ত বিকল্প নেই

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকট এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলেই ঘাটতি পূরণে অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকছে কম। এতে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের একটি বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বয়লারে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশে ওই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা।

ওই ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। আগস্টের শেষ দিক থেকে দিনের বেলায় আদানি থেকে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সময় প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের দেওয়া তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বয়লারটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু করা যাবে। পুরোপুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

এর প্রভাব গত বৃহস্পতিবার সারা দিনই দেখা গেছে। ওই দিন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ ওই সময় মোট চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল। তবে এর প্রধান কারণ ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়া। রাত ৯টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৮৭৯ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৬ মেগাওয়াট।

পিডিবির কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলে গত কয়েক সপ্তাহের মতোই লোডশেডিং চলতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপও হতে পারে।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর তুলনায় আদানি কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়াকে খুব বড় ঘাটতি মনে হওয়ার কথা নয়।

স্বাভাবিক সময়ে কোনো একটি কেন্দ্র থেকে কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। পিডিবির কর্মকর্তারা এমনটাই জানিয়েছেন।

কিন্তু এবার আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে রয়েছে।

বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভারী জ্বালানি তেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চাহিদা বেশি থাকলে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হচ্ছে।

চাহিদা বেশি থাকার সময়ে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা থাকছে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কম। আবার কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহ বা কারিগরি সমস্যা আছে। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে চাহিদার সময় বেশি চাপ দিয়ে চালাতে হচ্ছে। ফলে নতুন করে কোনো বড় কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে তা সামাল দেওয়ার মতো খুব বেশি সুযোগ নেই।

বৃহস্পতিবারের বড় ঘাটতিতে সপ্তাহজুড়ে চলা বিদ্যুৎ সংকট আরও বেড়েছে। ওই সপ্তাহের সাত দিনে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে।

দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের শুরু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়।

বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামও বেড়েছে। অস্থির স্পট মার্কেটের কারণে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন মোট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে এর পরিমাণ থাকে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

সর্বশেষ বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাস ব্যবহার করতে পারে এমন ৫৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৬টি, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ গ্যাসের সংকট, কম গ্যাসের চাপ বা অন্য কোনো সরবরাহ সমস্যায় রয়েছে।

এর মধ্যে কয়েকটি বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আবার কয়েকটি কেন্দ্র তাদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যখন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, তখন বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করার কথা ছিল।

দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।

উৎপাদন তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতার মাত্র ৬৭ শতাংশ ব্যবহার করা গেছে।

আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব কিছুটা কম ছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর কারণে। এর আগে কয়েক দিন রামপাল তার সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। বৃহস্পতিবার থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন বাড়ায়।

শুক্রবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার কেন্দ্রটি থেকে গড়ে মাত্র ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে কেন্দ্রটিতে একটি যন্ত্রের সমস্যা চলছে।

আরএনপিএলের ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার পটুয়াখালী কেন্দ্র থেকে গড়ে ৭১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। সেখানে কয়লা সরবরাহের সংকট রয়েছে।

রামপাল কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কেন্দ্রটির সক্ষমতা ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট।

এসএস পাওয়ার থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রটির সক্ষমতা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী সবচেয়ে বেশি সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদন করছে। ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কেন্দ্র থেকে বৃহস্পতিবার গড়ে মাত্র ১৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এই কেন্দ্রের সমস্যার কারণ হিসেবে নিম্নমানের কয়লার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্যাসের সংকট সামাল দিতে এবং চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার এখন তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপরও বেশি নির্ভর করছে।

সেপ্টেম্বর মাসে ৫৩টি সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্র থেকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন গড়ে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে গ্যাসের সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস শিল্পকারখানায় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল সরকারের।

তবে এখন পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল থেকে গড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে তা বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করা হচ্ছে।

চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো এরই মধ্যে বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু গড়ে এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন এখনো সরকারের সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।