দীর্ঘ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, এলএনজিতে ভর্তুকি বেড়ে হতে পারে ৩ গুণ

স্পট মার্কেটে দাম আকাশচুম্বী, কর্মকর্তাদের ধারণা এই অর্থবছরে গ্যাসে ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হতে পারে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন
আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ায় চলতি অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জন্য বাংলাদেশের ভর্তুকি ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ফলে সরকারকে অতিরিক্ত সহায়তার জন্য বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো ভেঙে পড়ায় জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এতে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্পট মার্কেটে দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে করোনা মহামারির পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ।

এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ বাড়াচ্ছে এলএনজি। গত বছর সরকার প্রাথমিকভাবে এলএনজি ভর্তুকির জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য এই খাতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলন করেছে, যা গত বছরের চূড়ান্ত ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এই সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে কেবল বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই গ্যাসের জন্য সরকার ভর্তুকি বাবদ খরচ করেছে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

বিশাল রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা। অর্থের জোগান বাড়াতে তুলনামূলক কম অগ্রাধিকারের অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর্থিক ক্ষতির এই ধারা শুধু গ্যাসেই সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ সতর্ক করেছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যেতে পারে। গত বছর এ খাতে ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, যেখানে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

২০২৬ সাল পর্যন্ত কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু, সেই চুক্তি ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে আবারও অস্থির স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান তিন এলএনজি সরবরাহকারীর মধ্যে কাতারও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ প্রয়োগ করেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স (জেডসিএ) গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকট আরও গভীর একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে—আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা।

এর একদিন আগে বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট ২৮ ডলারের বেশি দামে এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়, এটি ২০২২ সালের পর সবচেয়ে ব্যয়বহুল উদ্যোগ। শুধু এই এক চালানের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানসিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কঠিন হিসাব তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, ‘রিগ্যাসিফিকেশন ও টার্মিনাল চার্জ বাদ দিয়েও প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২৮ ডলার দরে কেনার অর্থ এলএনজির দাম ইতোমধ্যেই প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ টাকা বেশি।’

এলএনজির প্রচলিত একক ১ এমএমবিটিইউ বা ১ মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১০০ ওয়াটের প্রায় ৩ হাজার বৈদ্যুতিক বাতি এক ঘণ্টা জ্বালানো সম্ভব।

শফিকুল আলম বলেন, ‘পেট্রোবাংলা যে দামে গ্যাস পায়, তার সঙ্গে তুলনা করলে সরকারকে প্রতি ঘনমিটারে ৯৫ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে।’

গ্যাসের ঘাটতি প্রকৃত অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে। হরমুজে সরবরাহ বিঘ্নের মধ্যে এ সময়ে আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে ৬ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে।

গবেষণা সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ‘আমদানি কমার অর্থ ব্যয় কমা নয়।’ বছরের বাকি সময়ে জ্বালানির দাম যদি জানুয়ারি-আগস্টের গড় দরে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।

এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান, যা টাকা, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের সুদ ব্যয়ের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রিডও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর একটি ছিল ১১ আগস্ট। ওই দিন বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়, যা জাতীয় চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। এই সংকটে গ্রামাঞ্চলে দিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

শিল্পখাতে এর প্রভাব ভয়াবহ। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই বন্ধ হয়ে গেছে অথবা উৎপাদন কমিয়েছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমেছে বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দাম যতই হোক, সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসাগুলো এক উভয় সংকটে পড়েছে; হয় তাদের বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে, নয়তো কারখানা বন্ধ রেখে লোকসান গুনতে হবে।’

সম্প্রতি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আটটি কার্গো সংগ্রহ করেছে এবং ভারতের কাছে ডিজেল চেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে, ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭ এলএনজি কার্গো আমদানির জন্য একটি চুক্তিও করেছে ঢাকা।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পদ্ধতি আর্থিকভাবে ধ্বংসাত্মক হতে পারে। জেডসিএর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমান জ্বালানির দাম অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ে সতর্ক করে শফিকুল আলম বলেন, ‘প্রস্তাবিত সব টার্মিনাল যদি প্রায় ৬৫ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজি আমদানি বেড়ে প্রায় ৭৩০ বিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে।’

তিনি বলেন, প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১২ ডলার হলে এর জন্য বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। গড় দাম ২০ ডলারে উঠলে আমদানি ব্যয় ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।