প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় এখন উৎপাদকদের, না করলে নিবন্ধন বাতিল
একটি শ্যাম্পুর স্যাশে দোকান থেকে বের হওয়া পর্যন্ত সেটি প্রস্তুতকারকের মাথাব্যথা ছিল এতদিন। ক্রেতা এটি কিনে নেওয়ার পর কার্যত কোম্পানির দায় শেষ হয়ে যেত। এরপর খালি স্যাশেটি ময়লার ঝুড়ি, নালা কিংবা সরাসরি রাস্তায় পড়ে থাকত; এরপর সেটির কী হবে, তা নিয়ে প্রস্তুতকারকের সুস্পষ্ট দায় ছিল না।
তবে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সরকারি নতুন বিধিমালায় প্লাস্টিক প্যাকেজিং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওইসব পণ্য প্রস্তুতকারী, আমদানিকারক বা বিক্রেতা কোম্পানির ওপর দেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের আওতায় দৈনন্দিন ব্যবহারের বিস্তৃত পরিসরের পণ্য রয়েছে—পিইটি বোতলে বিক্রি হওয়া কোমল পানীয়, জুস ও মিনারেল ওয়াটার থেকে শুরু করে স্যাশেতে থাকা শ্যাম্পু, প্যাকেটে থাকা সস এবং মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিংয়ে থাকা চিপস ও স্ন্যাকস।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ভোক্তারা পণ্য ব্যবহারের পর কোম্পানিগুলোকে প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি অংশ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। না করলে কোম্পানিগুলোর পরিবেশগত নিবন্ধন বাতিল এবং কার্যক্রম বন্ধ করতে হতে পারে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ১৩ আগস্ট ‘এক্সটেনডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) গাইডলাইনস ২০২৬’ প্রকাশ করে। এই বিধিমালা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত সব—পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অপুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকা প্রযোজ্য হবে। এতে তালিকাভুক্ত পণ্যের প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কোম্পানিগুলোকে এককভাবে অথবা যৌথভাবে এসব বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও অপসারণ করতে হবে। তবে রপ্তানি আদেশের বিপরীতে পণ্য উৎপাদনকারী রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বিধিমালার আওতামুক্ত থাকবে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তর ধাপে ধাপে কোম্পানিগুলোর তালিকা করবে। প্রথম ২ বছরে বড় শিল্প, পরবর্তী ২ বছরে মাঝারি শিল্প ও পঞ্চম বছরে ছোট শিল্পের তালিকা করা হবে।
তালিকাভুক্ত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন ৩ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে কোনো কোম্পানি বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন নবায়ন করা হবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ২০২২ সালে একই ধরনের বিধিমালা চালু করে। পাকিস্তান ২০২৩ সালে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক প্রোহিবিশন রেগুলেশনস প্রকাশ করে। শ্রীলঙ্কাও বাধ্যতামূলক একটি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, নেপাল ও ভুটান এ ধরনের ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা মোটামুটি ২০০টি টাইটানিকের পণ্যবাহী ধারণক্ষমতার সমান। বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এর মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়।
প্লাস্টিক বর্জ্যের ৫ ধরন, ন্যূনতম ১৫ শতাংশ সংগ্রহ
নির্দেশিকায় প্লাস্টিক পণ্যকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো—রিজিড বা শক্ত প্লাস্টিক, যার মধ্যে এমন শক্ত ও কাঠামোগতভাবে দৃঢ় পণ্য রয়েছে, যেগুলো নিজেদের আকৃতি ধরে রাখে। এর মধ্যে রয়েছে কোমল পানীয় ও অন্যান্য পানীয়র বোতল, প্রসাধনসামগ্রী ও কসমেটিকসের বোতল, কনটেইনার ও জার।
দ্বিতীয়টি নমনীয় প্লাস্টিক, যার মধ্যে রয়েছে শ্যাম্পুর স্যাশে, খাবারের পাউচ, ক্যারি ব্যাগ, পলিথিন ও মাল্টিলেয়ার প্লাস্টিক প্যাকেজিং।
তৃতীয়টি হলো স্টাইরোফোম ও এক্সপ্যান্ডেড পলিস্টাইরিন—হালকা ফোমজাত প্লাস্টিক, যা সাধারণত তাপ নিরোধক ও একবার ব্যবহারযোগ্য খাবারের কনটেইনারে ব্যবহৃত হয়। প্লেট, কাপ ও খাবারের প্যাকেজিং বাক্স এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
চতুর্থ শ্রেণি হলো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। পঞ্চম শ্রেণিতে রয়েছে অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য, যার মধ্যে রয়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপার ও সিগারেটের ফিল্টার।
তালিকাভুক্তির প্রথম দুই বছরে কোম্পানিগুলোকে তাদের প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্তত ১৫ শতাংশ সংগ্রহ এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করতে হবে।
এই ১৫ শতাংশের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে কোন কোম্পানি প্রতি বছর কী পরিমাণ প্লাস্টিক প্যাকেজিং উৎপাদন বা বাজারজাত করে, তার ভিত্তিতে। নির্ধারিত প্রতিটি শ্রেণির প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য কোম্পানিগুলোকে ন্যূনতম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে।
পরবর্তী বছরগুলোতে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ করা হবে।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত সংগ্রহ করা বর্জ্য সরকার অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্লাস্টিক ক্রেডিট হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যাবে।
সরকার আশা করছে, এই নির্দেশিকার মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ, আরও বেশি অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং একটি সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
সামুদ্রিক পরিবেশে প্লাস্টিক দূষণ কমানোর প্রচেষ্টা জোরদার এবং প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণ করাও এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
‘আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়’, বলছে আরএফএল
দেশের বড় প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক আরএফএল বলছে, তারা ইতোমধ্যেই তাদের প্লাস্টিক বর্জ্যের ২০ শতাংশের বেশি পুনর্ব্যবহার করছে। ফলে শর্ত পূরণে তাদের কোনো সমস্যা হবে না।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পল বলেন, ‘পুরো বিধিমালা মেনে চলতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।’
বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, বছরের পর বছর ধরে দেশে প্রায় ৩০০টি ছোট ও মাঝারি আকারের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী কারখানা গড়ে উঠেছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও আকিজ গ্রুপসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারে বিনিয়োগ করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন বিধিমালা ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পল বলেন, কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এসব শর্ত মেনে চলা কঠিন হতে পারে।
‘প্লাস্টিক একটি জটিল শিল্প। ভবিষ্যতে সরকার যদি কঠোরভাবে এসব শর্ত বাস্তবায়ন করে, তাহলে অনেক ছোট ব্যবসা হয়তো টিকে থাকতে পারবে না,’ যোগ করেন তিনি।
প্রায় দুই দশক আগে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) চালুর সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি এর তুলনা করেন। পল বলেন, বড় কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে বিধিমালা মেনে নিলেও অনেক ছোট কারখানা এখনো ইটিপি পরিচালনা করে না।
‘আমার মনে হয়, এখানেও একই ঘটনা ঘটবে। আমরা যারা ইতোমধ্যে পুনর্ব্যবহার শুরু করেছি, তারা চালিয়ে যাব। ছোট ব্যবসাগুলো সামর্থ্য থাকলে বিধিমালা মেনে চলবে; না হলে অনেকেই তা করবে না,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘পলিথিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কত সময় লেগেছিল, মনে আছে? বহু বছর। আর এখনো বিভিন্ন রূপে পলিথিনের ব্যবহার হচ্ছে।’
কেন কিছু কোম্পানি এটিকে ‘অবাস্তব’ বলছে
ড্যানিশের বাণিজ্য বিভাগের প্রধান সাইয়েদুল আজহার সারওয়ার মনে করেন, নতুন বিধিমালা ব্যবসাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
‘ধরা যাক, আপনি গুঁড়া দুধের একটি প্লাস্টিক বা ফয়েলের প্যাকেট ব্যবহার করলেন। ব্যবহারের পর আপনার বাড়ি থেকে আমি কীভাবে সেই প্যাকেট সংগ্রহ করব?’
ভোক্তাদের কাছ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের জন্য পুনর্ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সারওয়ার বলেন, আরেকটি বিকল্প হতে পারে আবাসিক এলাকায় প্লাস্টিক, ক্যান ও অন্যান্য বর্জ্যের জন্য পৃথক সংগ্রহকেন্দ্র চালু করা।
এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডসের বিজনেস ডিরেক্টর কামরুল হাসানের ভাষ্য, প্লাস্টিক প্যাকেজিং সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব প্রস্তুতকারকদের ওপর দেওয়া বাস্তবসম্মত হবে না।
তিনি এমন একটি বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন, যেখানে গৃহস্থালি বর্জ্যকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে: রান্নাঘরের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও কাগজের মতো শুকনো বর্জ্য এবং মানববর্জ্য।
কামরুল বলেন, বড় শহরগুলোতে ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের স্থাপনা ব্যয়বহুল হবে এবং এতে সরকারের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, অন্যান্য দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তার কলম্বো সফরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে কামরুল বলেন, সেখানে বর্জ্যকে সার ও বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, শিল্পখাতের প্রস্তাব অনুযায়ী এই বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।
‘আমরা প্রথমে স্বেচ্ছামূলকভাবে প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলাম, এরপর পরবর্তী ৫ বছরে ধীরে ধীরে এটিকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তাদের এই শর্তগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও আমরা দিয়েছিলাম,’ বলেন তিনি।
