‘ভ্যালি ফিভারে’ বছরে মারা যেতে পারে হাজারো মানুষ
মাটিতে জন্মানো এক ধরনের ছত্রাকের রেণু বাতাসে ভেসে ফুসফুসে প্রবেশ করে, এরপর শুরু হয় প্রদাহ। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুক ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা—এ রকম আরও কিছু উপসর্গ দেখে মনে হতে পারে মৌসুমি জীবাণুর সংক্রমণ কিংবা নিউমোনিয়া।
আর এখানেই ঘটে বিপত্তি; রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়ে যায় অনেক। কেবল মানুষই নয়, গৃহপালিত প্রাণীরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
দুটি ঘটনা থেকে এই রোগের ভয়াবহতা বোঝা যাবে। ২০১৯ সালে লাস ভেগাসের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী গুইয়েরে ওয়ালটন এই ‘ভ্যালি ফিভারে’ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি নানা উপসর্গে ভোগেন; শেষ পর্যন্ত মারা যান।
এর আগে ২০১২ সালে ফিনিক্সের এক বিমানবন্দরে ধূলিঝড়ের সময় ভ্যালি ফিভারে আক্রান্ত হয়েছিলেন ডা. রবার্টা ডেলুকা। এরপর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। সাত বছর পরও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্তপারের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েককটি এলাকায় এই ছত্রাক পাওয়া যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম কক্সিডিওডোমাইকোসিস।
ক্যালিফোর্নিয়ার ‘সান হোয়াকিন ভ্যালি’ এলাকায় প্রথম এই রোগের প্রকোপ দেখা গিয়েছিল, তাই এর নাম দেওয়া হয় ‘ভ্যালি ফিভার’।
এক গবেষণায় দেখা যায়, তাপমাত্রা এই রোগকে প্রভাবিত করে।
এতে বলা হয়—‘গড়ে জুন-জুলাই ও অক্টোবর-নভেম্বরে ছত্রাকের রেণুর সংস্পর্শে আসার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। কারণ বছরের এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। অন্যদিকে বাতাসে আর্দ্রতা তুলনামূলক বেশি থাকায় ফেব্রুয়ারি, মার্চ, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সংস্পর্শের ঘটনা কম ঘটে।’
গবেষণা প্রতিবদেন অনুসারে—ধূলিঝড় এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। আর এই রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা।

বিশেষজ্ঞরা এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের ধূলিঝড়ের সময় ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন।
এছাড়া বাইরে গেলে এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের কথাও বলেন তারা। তবে এতে শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কি না তা প্রমাণিত হয়নি।
যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ভ্যালি ফিভার’ শনাক্ত হতেই অনেক দেরি হয়ে যায়, তাই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এই সংক্রমণ শনাক্ত করার একমাত্র উপায় হলো পরীক্ষাগারে রক্ত পরীক্ষা করা। দেখা হয়, নমুনায় কক্সিডিওডোমাইকোসিস অ্যান্টিবডি বা অ্যান্টিজেন আছে কি না। যারা স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন না, তাদের চিকিৎসায় অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
এই সংক্রমণ একজনের কাছ থেকে আরেকজনে ছড়ায় না। যে কারণে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে ‘ভ্যালি ফিভার’ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেই। তবে এসব এলাকায় বসবাস কিংবা ভ্রমণ করলে মানুষ ও প্রাণী আক্রান্ত হতে পারে।
ভারতীয় গণমাধ্যম জানাচ্ছে, গত ৫ মে ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত ৩৭ বছর বয়সী ভারতীয় এক তথ্যপ্রযুক্তিকর্মী ভ্যালি ফিভারের মারা গেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চিরঞ্জীবী কোল্লা গত প্রায় এক মাস ধরে ভুগছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিপজিশনের (সিডিসি) তথ্য বলছে—সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যালি ফিভারে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এর বেশির ভাগই দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ও অ্যারিজোনায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ শনাক্তে ভুল হয়। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর ১০ থেকে ১৮ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। সিডিসির নথি অনুসারে, প্রতি বছর প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ জনের মধ্যে হতে পারে।