কেন লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চায় না ইসরায়েল
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
কিন্তু লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের চলমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের মিত্র লেবাননের সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে। যার ফলে ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে নতুন যুদ্ধের শুরু হয়।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও ইরান দাবি করে—এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ সংঘাতপূর্ণ সকল ফ্রন্টের জন্যই প্রযোজ্য।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন পড়বে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেবাননের সংঘাতকে একটি 'পৃথক যুদ্ধ' বা আলাদা লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করছেন।
এর ফলে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েকঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের রাজধানী বৈরুত, বেকা উপত্যকাসহ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
যুদ্ধবিরতির পর এই হামলা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এই হামলার পর ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কেন লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চায় না?
সামরিক লক্ষ্য ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
ইসরায়েল লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, তাদের প্রধান সামরিক লক্ষ্য—হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে দুর্বল করা। এই লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনীকে লেবাননের বিশাল অংশ দখল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে হাজার হাজার সৈন্য লেবাননের ভূখণ্ডে ৬ মাইল ভেতর পর্যন্ত ঢুকে অবস্থান করছে।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন—যারা ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আঘাত হানবে, তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল আক্রমণ চালিয়ে যাবে।
ইসরায়েলি সরকার আরও জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করা যাবে না, তারা লেবানন থেকে নিজেদের সেনা সরাবে না। এই সামরিক বাধ্যবাধকতা পূরণে ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর শতাধিক সদরদপ্তর, সামরিক স্থাপনা ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানায় আল জাজিরা।
ইরান-হিজবুল্লাহ সম্পর্ক
ইসরায়েল ও লেবাননের বর্তমান সংঘাত মূলত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল একে ভিন্ন সংঘাত বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, ইরান মনে করে লেবানন এবং তাদের 'অ্যাক্সিস অব রেজিসট্যান্স' এই যুদ্ধবিরতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিংস কলেজ অব লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেস ক্রেইগ আল জাজিরাকে বলেন, লেবাননকে বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতি হলে তা ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করবে। মূলত লেবাননে আক্রমণ অব্যাহত রেখে ইসরায়েল ইরানের সামরিক সংকল্প এবং মিত্রদের রক্ষা করার সদিচ্ছা পরীক্ষা করছে।
নেতানিয়াহু সরকারের অবস্থান
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলকে লেবাননে সামরিক অভিযান থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করে না। এদিকে ইসরায়েল ঐতিহাসিকভাবেই হিজবুল্লাহর আলোচনায় আগ্রহী নয়।
অদ্যনিকে, হামলা চলতে থাকলে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে নারাজ বলে জানায় দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
যুদ্ধবিরতি না হলে
লেবাননে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি না হওয়ার সুদূরপ্রসারী এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সদ্য ঘোষিত 'ভঙ্গুর' যুদ্ধবিরতি চুক্তি যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে।
এএফপি জানায়, হামলা বন্ধ না হলে হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরা, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দ্বিতীয়ত, লেবাননকে বাদ দিলে সমগ্র অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের এই কৌশলগত সফলতা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের ভেতরেই সংশয় রয়েছে বলে জানায় বিবিসি।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারাই স্বীকার করেন যে, শুধু শক্তি প্রয়োগ করে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সম্ভব নয় এবং এই হামলাগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল হয়তো কিছু সামরিক সুবিধা পাবে, তবে তা অত্যন্ত সীমিত হবে।
ফলে, যুদ্ধবিরতির আওতায় না আনা শুধু লেবাননে গভীর মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনবে না, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।