আগুনে নিঃস্ব বস্তিবাসীর অনেকেরই ঈদ কাটবে কালশী ফ্লাইওভারের নিচে
রাজধানীতে সকাল থেকেই আকাশ কালো, থেমে থেমে বৃষ্টি। ৫৫ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম ও তার নাতি-নাতনিদের মাথার ওপর ছাদ বলতে এখন শুধুই কালশী ফ্লাইওভার। নিঃস্ব আনোয়ারা বেগমের দৃষ্টি কালশী বস্তির পোড়া ধ্বংসাবশেষের দিকে। গত কুড়িটি বছর, এই জায়গাটিকেই মেনে নিয়েছিলেন নিজের ‘ঘর’ হিসেবে।
কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ঈদুল আজহার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এখন তার পরনে থাকা কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আনোয়ারার মতো প্রায় হাজারখানেক মানুষের একই দশা। গত সন্ধ্যার আগুন কেড়ে নিয়েছে তাদের শেষ সম্বলটুকুও।
‘আমাদের সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। আমরা শুধু প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছি,’ আজ মঙ্গলবার দুপুরে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আনোয়ারা।
গতকাল রাতে পল্লবীর কালশী বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে ২৫০টিরও বেশি ঘর এবং প্রায় ৫০টি দোকান পুড়ে যায়। ঈদুল আজহার মাত্র দুদিন আগে গৃহহীন হয়ে পড়েন প্রায় হাজারখানেক মানুষ। আনোয়ারা মতোই ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে এই মানুষগুলোর। গতকাল রাতও তাদের কেটেছে এই ফ্লাইওভারের নিচেই।
এই আগুন শুধু তাদের ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্রই নয়, পুড়িয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা সঞ্চয় আর স্বপ্নও।
আনোয়ারা তার তিন সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ১৮ বছর ধরে ওই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে দুটি ছোট ঘরে থাকতেন। এখন তারা আশ্রয় নিয়েছেন ফ্লাইওভারের নিচে।
তার স্বামী নাসির উদ্দিন কাজের সন্ধানে বহু বছর আগে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। দুজনে মিলে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন—এখানে থেকেই।
আনোয়ারা জানান, শেষ কিছুদিন ধরে উচ্ছেদের আতঙ্কে পুরো এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকে বিকল্প বাসস্থানের খোঁজে হিমশিম খাচ্ছিলেন।
‘আমরা অনুরোধ করেছিলাম যেন ঈদের পর পর্যন্ত থাকতে দেয়। বলেছিলাম, তিন দিন পর চলে যাব,’ বলেন আনোয়ারা। সেই অনুযায়ী ঈদের তিন দিন পর থেকে পুনরায় বস্তির উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল।
অথচ তার আগেই, গতকাল সন্ধ্যায় বস্তিতে আগুন লাগে এবং দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘিঞ্জি বসতিতে।
ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাট ও আসবাবসহ প্রায় এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের জিনিসপত্র হারিয়েছে আনোয়ারার পরিবার।
‘আমরা প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। কিছুই বাঁচাতে পারিনি। এখন জানি না কোথায় যাব। কোনো ঘর না পাওয়া পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচেই থাকব,’ সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন তিনি।
আনোয়ারার মতোই আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা প্রায় ৬০ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন।
বস্তিতে তার ১০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও একটি গ্যারেজ ছিল। প্রথমে পাঁচটি রিকশা বের করা গেলেও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনটি চুরি হয়ে যায়। আর বাকিগুলো আগুনে পুড়ে যায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে বসবাস দেলোয়ারের, পরিচালনা করতেন ১২টি ভাড়ার ঘর।
‘সব শেষ হয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।
উচ্ছেদ পরিকল্পনার কারণে বাসিন্দাদের ঈদের পর এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছিল বলে জানান দেলোয়ার। বলেন, ‘আমরা সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই আগুন সবকিছু শেষ করে দিল।’
প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ডেইলি স্টারের কাছে দাবি করেন তিনি। এখনো প্রায় ৫ লাখ টাকার ঋণের বোঝা তার কাঁধে রয়েছে বলেও জানান।
ফ্লাইওভারের নিচে বসে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী আসমা বেগম। আগুনে পুড়ে গেছে তার ভাড়ার দুটি ঘর। যেখানে মাসে ৬ হাজার টাকা দিয়ে থাকতেন স্বামী, সাত মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে।
স্বামী বর্জ্য আর তিনি নিজে ভাঙারি সংগ্রহের কাজ করতেন। উচ্ছেদের শঙ্কার কারণে ঈদের আগে কিছু জিনিসপত্র গ্রামে পাঠিয়ে দিলেও বাকি যা ছিল, আগুনে পুড়ে গেছে।
‘এই ফ্লাইওভারের নিচেই ঈদ কাটবে,’ বলেন আসমা।
পোড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে এখন পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ ও বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করতে চান তিনি। যাতে ঈদের পর অন্তত গ্রামে ফিরে যেতে পারেন।
গতকাল সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার চেষ্টার পর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আজাদ আনোয়ার জানান, নিয়ন্ত্রণকক্ষ রাত ৭টা ২৩ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায়।
তিনি বলেন, ‘বস্তিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ঘর ও ভাঙারির দোকান ছিল। যেখানে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বাস করতেন।’
অবশ্য গত সপ্তাহে চলা উচ্ছেদ অভিযানে খালি হয়ে গিয়েছিল কালশী বস্তির প্রায় ৮০ শতাংশ। বাকি থাকা অংশের বাসিন্দারা আগুনে নিঃস্ব হয়ে এখন আছেন মানবিক বিপর্যয়ে।
কাছাকাছি পানির উৎস না থাকায় ১৫টি পানিবাহী যান আনা হয়। ভাঙারি ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের কারণেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন, পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘আগুন লাগার কারণ এখনও জানা যায়নি। তদন্তের পর তা নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। তবে সোমবার রাত পর্যন্ত কোনো হতাহত বা নিখোঁজের খবর পাওয়া যায়নি।’
পুড়ে যাওয়া এলাকার সামনে তিন সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল টিম প্রায় ৬০ জন আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই দগ্ধ ও কাটা-জখমের রোগী।
এদিকে, আগুন লাগানোর অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী নাজমুল হাসান মনিকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে বস্তিবাসী।
বাসিন্দাদের দাবি, নাজমুলের সঙ্গে এক দোকানদারের বিরোধ ছিল। সেই সূত্রে দিনের শুরুতেই বস্তিতে আগুন লাগানোর হুমকি দিয়েছিলেন নাজমুল। পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘এ ঘটনায় মামলা করা হচ্ছে এবং তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।’