৭ জানুয়ারিও বড়দিন
প্রায় সব জায়গাতেই বড়দিনের সাজসজ্জার আলো নিভে এসেছে। নামিয়ে ফেলা হয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। ঠিক সেই সময়েই বিশ্বের অনেক জায়গার খ্রিস্টানরা তাদের বড়দিনের উৎসব শুরু করেছেন।
৭ জানুয়ারি, যা অনেকের কাছে 'ওল্ড ক্রিসমাস ডে' নামে পরিচিত, পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থোডক্স ও কপটিক সম্প্রদায়ের খ্রিস্টানরা বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠেন।
সংখ্যাটি নেহায়েত কম নয়, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি।
দুই ক্যালেন্ডারের গল্প
ভিন্ন দিনে উদযাপনের কারণ যিশুর জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ নয়, বরং সময় গণনার পদ্ধতির পার্থক্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খ্রিস্টান বিশ্ব জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে আসছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার প্রবর্তন করেন তারিখ গণনার এই পদ্ধতি। তবে এই পদ্ধতিতে সৌর বছরের হিসাব ১১ মিনিট বেশি ধরা হয়েছিল, ফলে প্রতি ১২৮ বছরে ক্যালেন্ডার এক দিন করে পিছিয়ে পড়ত।
১৫৮২ সালে ঋতুর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের বড় ধরনের অমিল দেখা দিলে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি আরও নির্ভুল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। ক্যাথলিক চার্চ এবং পরে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করে নেন। ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক অবস্থানে ফিরতে একসঙ্গে ১০ দিন বাদ দেওয়া হয়।
তবে বহু অর্থোডক্স ও পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টান চার্চ তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেই থেকে যান।
বর্তমানে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে। ফলে এই চার্চগুলো যখন তাদের প্রাচীন পদ্ধতিতে ২৫ ডিসেম্বর উদযাপন করে, তা বিশ্বের অন্য অংশের ক্যালেন্ডারে পড়ে ৭ জানুয়ারি।
এই ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২১০১ সালে গিয়ে অর্থোডক্স ক্রিসমাস আরও একদিন বেড়ে হবে ৮ জানুয়ারিতে।
কারা উদযাপন করেন
বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ আছেন প্রায় ২৩০ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি মানুষ জানুয়ারির ৭ তারিখে বড়দিন উদযাপন করেন।
এর মধ্যে রয়েছেন—
• রুশ অর্থোডক্স চার্চ, যা এই ঐতিহ্য অনুসরণকারী সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী।
• মূলত মিসরভিত্তিক কপটিক অর্থোডক্স চার্চ।
• ইথিওপিয়ান ও ইরিত্রিয়ান অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চ।
• সার্বিয়ান ও জর্জিয়ান অর্থোডক্স চার্চ।
কিছু অঞ্চলে এই উৎসব সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রতীক। বেলারুশ, মলদোভা এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কিছু অংশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কথা বিবেচনায় রেখে ২৫ ডিসেম্বর ও ৭ জানুয়ারি—দুই দিনই জাতীয় ছুটি হিসেবে পালন করা হয়।
ঐতিহ্য ও ভূরাজনীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড়দিনের তারিখ ভূরাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইতিহাসগতভাবে গ্রিস ও রোমানিয়ার মতো দেশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চার্চের উদযাপন ২৫ ডিসেম্বর সরিয়ে নেয়।
সবশেষ ২০২৩ সালে ইউক্রেন সরকার রাশিয়ার ঐতিহ্য থেকে দূরে থাকার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটি ২৫ ডিসেম্বরে স্থানান্তর করে। যদিও দেশটির অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে এখনো ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন।
বৈশ্বিক সময় গণনা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা
দুই ভিন্ন বড়দিনের এই তারিখ বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে সময় গণনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির দারুণ দৃষ্টান্ত।
গ্রেগরিয়ান ও জুলিয়ান—দুটিই সূর্যের গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সৌর ক্যালেন্ডার। এছাড়া সংস্কৃতিভেদে রয়েছে আরও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি।
• চন্দ্র ক্যালেন্ডার: ইসলামি ক্যালেন্ডার, যা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল এবং সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১০–১২ দিন ছোট।
• চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডার: ইহুদি, হিন্দু ও চীনা ক্যালেন্ডার, যেখানে দিনের হিসাব চাঁদের ওপর হলেও মাস সমন্বয় করা হয় সূর্যের চক্র অনুযায়ী।
দুই ভিন্ন তারিখে বড়দিন উদযাপনের কারণ বুঝতে সহজ একটি রূপকের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। দুটি ঘড়ি একই সময়ে চালু করা দুটি ঘড়ির একটি খানিকটা ধীরে চলে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই সামান্য পার্থক্যই আজ ১৩ দিনের ব্যবধানে রূপ নিয়েছে।
ফলে বিশ্বে বড়দিনের উৎসবের আমেজ আসে দুই দফায়।