কেন হাম প্রতিরোধে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন হলো না, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক

দেশে শিশুস্বাস্থ্য বর্তমানে নতুন এক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, হাসপাতালগুলোর করিডোরে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ২৪ শিশু। আর সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৭। আর, হামে আক্রান্ত হয়ে ৬৮ ও উপসর্গ নিয়ে ৩৫৬ শিশু মারা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে আমাদের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করতে হবে। ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা ‘সামষ্টিক প্রতিরোধ সক্ষমতা’ যেকোনো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সর্বোত্তম প্রতিকার পদ্ধতি।

হার্ড ইমিউনিটি কী?

২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি ছড়ানোর পর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিল ‘হার্ড ইমিউনিটি’। এটি অর্জন হলে ভাইরাস ছড়ালেও সেটি সাধারণত মরণঘাতী হতে পারে না। আর এটি তখনই কাজ করে যখন কোনো জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ অংশকে প্রতিষেধক দেওয়া থাকে।

ডা. বে-নজির আহমেদ
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজির আহমেদের মতে, জনগণের একটি অংশকে নির্দিষ্ট কোনো রোগের ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া হলে তাদের মধ্যে ওই রোগের আর সংক্রমণ হয় না। এটাই ‘হার্ড ইমিউনিটি’।

যেমন—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে ও প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে একটি দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকাদান নিশ্চিত করতে হয়। এর নিচে নামলে সামগ্রিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে কি হামের ‘হার্ড ইউমিউনিটি’ অর্জন হয়নি?

হামসহ শিশুদের রোগপ্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকাদানের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে বেশ সুনাম ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে হাম প্রতিরোধে আমাদের সামষ্টিক প্রতিরোধ সক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের হাম-রুবেলার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এমআর-১ ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর-২ টিকা দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হামের টিকাদানের প্রথম ডোজ ১০০ দশমিক ১ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছিল।  

২০২৪ সালে ৯৭ দশমিক ৮২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ ও ৯৬ দশমিক ১৪ শতাংশ দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়েছিল।

২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যায়। ওই বছর প্রথম ডোজ পেয়েছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিশু ও দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছিল ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

ডা. মুশতাক হোসেন
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

তবে, টিকাদানের এই প্রাথমিক তথ্যকে সাধারণত ‘ক্রুড ভ্যাক্সিনেশন ডেটা’ বলা হয়, যেখানে এমন শিশুদেরও গণনায় ধরা হয় যারা নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে টিকা নিয়েছে। প্রকৃত কাভারেজ ডেটায় শুধু সঠিক সময়ে বা নির্ধারিত বয়সী শিশুদের দেওয়া ডোজ গণনা করা হয়।

স্বাস্থ্যখাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মানেই সামষ্টিক প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি নয়। কারণ, এটা শুধুই সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা, দেশের সব শিশুর হিসাবে নয়।

২০২৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা সংক্রান্ত একটি সার্ভের বরাতে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর হামের প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছিল দেশের মোট শিশুর ৮৬ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছিল ৮০ দশমিক ৭০ শতাংশ।

অথচ, সরকারি লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে সেবার প্রথম ডোজ দেওয়ার হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, নির্দিষ্ট শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ মানেই ওই সংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে এমন নয়। এটা শুধুই লক্ষ্য পূরণ। ৯৫ শতাংশ লক্ষ্য পূরণ হলেও বলা যাবে না যে দেশের ৯৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে।

কেন ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন হলো না

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত হাম শনাক্ত শিশুর প্রায় ৭৪ শতাংশই ভ্যাকসিনের দুটি ডোজের একটিও নেয়নি। ১৪ শতাংশ মাত্র একটি ডোজ নিয়েছিল। আর আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশের বয়সই ৯ মাসের নিচে—যা প্রথম ডোজ নেওয়ার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম।

গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় ৯৯ থেকে ১০০ ভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।

ডা. বে-নজির আহমেদ
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

কিন্তু, এই অর্জন মানেই সামষ্টিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে বলা যাবে না।

ডা. বে-নজির আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকার যেগুলো বলছে এগুলো কতটুকু সঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যেমন, ২০২৪ ও ২৫ সালে বিক্ষোভ-আন্দোলনের মধ্যে এত কাভারেজ কীভাবে হয়? তখন স্বাস্থ্য বিভাগ অচল হয়েছিল, অনেক স্বাস্থ্যকর্মী টিকা দিতে যায়নি। তাহলে কীভাবে এত টিকাদান সম্পন্ন হলো?’

‘সরকারের টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মানে হলো রিপোর্টেড কাভারেজ, যা প্রকৃত তথ্য নয়’ বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্যমাত্রা বিবিএস বা আগে কতজনকে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেটার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে না যে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হচ্ছে।’

‘আসল কথা হলো টিকা দেওয়া হয়নি এবং এর ফলেই এবার হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। সরকারের রিপোর্টেড কাভারেজের তথ্য তৈরি করা যায়। এটা স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া তথ্যের ওপর তৈরি করা,’ বলেন ডা. বে-নজির।

এ বিষয়ে ডা. মুশতাক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসে এবারের মতো আমাদের দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। কারণ, যে শিশুরা টিকা থেকে বাদ পড়ে যায় তাদেরও গণ-টিকাদান কর্মসূচির আওতায় চতুর্থ রাউন্ড পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়।’

কিন্তু, সম্প্রতি টিকাদানে একটা ‘ব্রেকডাউন’ হয়েছে বলে এবার হামের এমন প্রাদুর্ভাব হয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘এবার ৬ মাসের কম বেশি শিশুদের যেমন হাম হচ্ছে, বয়স্কদেরও হচ্ছে। অর্থাৎ, অনেকেই টিকার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে যাদের হাম হওয়ার কথা না তাদেরও হচ্ছে।’

‘দু-তিন বছর পরপর গণ-টিকাদানের সম্পূরক ক্যাম্পেইন হয়’ উল্লেখ করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এরপরেও প্রতিবছর যদি ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়, সেখানেও ৫ শতাংশ শিশু বাদ রয়ে যায়। এভাবে গত ৫ বছরে বড় একটা অংশ টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে “হার্ড ইমিউনিটি” অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি শেষ হলে সারাদেশে পৃথকভাবে সার্ভে করা হয় যে, প্রকৃতপক্ষে কত শিশু টিকার আওতায় এলো তা জানতে। ওই সার্ভেতে দেখা যায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরেও সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের জন্য বড় একটা অংশ টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।’

যেভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন হতে পারে

ডা. মুশতাক হোসেন
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কেবল রুটিন টিকাদান যথেষ্ট নয়, বরং এর সঙ্গে সম্পূরক বা গণটিকাদানের নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. মুশতাক।

তিনি জানান, হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের গাণিতিক হিসাব হলো—প্রথম ডোজ দেওয়ার পর প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার জন্য ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। আর বিশেষ কর্মসূচিতে বড় শিশুদের (৫ বছর পর্যন্ত) টিকা দিয়ে শক্তিশালী সুরক্ষা দেয়াল তৈরি করতে হবে।

‘বর্তমানে যে জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি চলছে, তার মাধ্যমে যদি বাদ পড়া বিপুল সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা যায় এবং আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর রুটিন টিকাদান (দুই ডোজ) কোনো বিঘ্ন ছাড়াই চালু থাকে, তবেই বাংলাদেশ পুনরায় হামের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে সক্ষম হবে,’ বলেন ডা. মুশতাক।

ডা. বে-নজির আহমেদের মতে, হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে, জন্মহারের তথ্য নিয়ে যেখানে যত শিশু জন্ম নিচ্ছে সেখানকার ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, ‘শহর-গ্রাম থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ডোর-টু-ডোর কত শিশু আছে, কত টিকা লাগবে এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করে নিখুঁত হিসাব করে কাভারেজ দিতে পারলেই হামের হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে,’ বলেন তিনি।

‘সরকারকে সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে স্থানীয়ভাবে জন্মহারের তথ্য নিয়ে শিশুদের টিকা দিতে হবে। এটাই টার্গেট করা উচিত হার্ড ইমিউনিটির জন্য,’ বলেন এই বিশেষজ্ঞ।