কলের পানির ৯৮ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছাঁকতে পারে ‘অলৌকিক গাছ’
বিশ্বজুড়ে এখন ‘মাথাব্যথার’ একটি নতুন কারণ প্লাস্টিক। সাশ্রয়ী মূল্যের প্লাস্টিক জীবনকে পণ্য যতটা না সহজ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিতে ফেলেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, খাবার ও পানীয় প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত বোতল কিংবা বক্স থেকে অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এছাড়া একটি বৈশ্বিক গবেষণায় সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ কলের পানির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার পাওয়া গেছে।
এই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার ইতোমধ্যেই প্রাণীদের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। গবেষকদের মত, মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
সিনথেটিক কাপড়কেও গবেষকরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জার্নাল অব কনটামিন্যান্ট হাইড্রোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে ৭৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিচাপা কিংবা ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ ও ইঁদুরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি করেছে। এমনকি অ্যান্টার্কটিকার তাজা তুষারেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
প্লাস্টিকের এই ভয়াবহ বিপদের মধ্যেই আশার আলো দেখিয়েছেন ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী। গত এপ্রিলে প্রকাশিত তাদের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, খাবার পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পারে সজনেগাছের বীজ।
‘অলৌকিক গাছ’ বা মিরাকল ট্রি হিসেবে পরিচিত সজনে পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ উদ্ভিদগুলোর একটি। এর ঔষধি গুণের কদর অনেক আগে থেকেই। নতুন গবেষণা বলছে, এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এটি পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে অত্যন্ত কার্যকর।
ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানীর মতে, দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছের বীজের নির্যাস পানীয় জল থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে প্রচলিত রাসায়নিকের মতোই কার্যকর।
গবেষণাপত্রের সহলেখক এবং সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির (ইউনেস্প) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস জানিয়েছেন, প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয়রাও পানি বিশুদ্ধ করতে সজনে গাছের ব্যবহার করতেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার বছর ধরে পানি বিশুদ্ধ করতে সজনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।’
অধ্যাপক আদ্রিয়ানো ও তার সহকর্মীরা গত এক দশক ধরে সজনে বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। পানি বিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তঞ্চনকারী পদার্থ হিসেবে এর ভূমিকা নিয়ে তারা কাজ করছেন। এই বীজ পানির ক্ষুদ্র কণাগুলোকে একত্রিত করে ফেলে, যাতে সেগুলো সহজে ছেঁকে ফেলা যায়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, যা ১ ইঞ্চির ২৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ (১ মাইক্রোমিটার) পর্যন্ত ছোট হতে পারে।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় বিশ্বের কলের পানির ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো মানুষের মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় জায়গা করে নিচ্ছে।
মানুষের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। তবে প্রাণীর ওপর গবেষণায় প্রজনন সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বোতলজাত পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গবেষকরা বিশেষভাবে পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আদ্রিয়ানো বলেন, ‘কারণ এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর পদার্থগুলোর মধ্যে অন্যতম।’
গবেষণায় সজনে বীজের নির্যাস ব্যবহার করে গড়ে ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক (মানুষের চুলের গড় পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ) ফিল্টার করা হয়। এতে দেখা যায়, সজনে বীজের নির্যাস কলের পানি থেকে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে সক্ষম। অর্থাৎ প্রাকৃতিক এই উপাদান বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক কোয়াগুল্যান্ট অ্যালুমিনিয়াম সালফেটের (ফিটকিরি) প্রায় সমান কার্যকর।
তারা বলছেন, সজনে বীজ বেশি ক্ষারীয় পানিতে ফিটকিরির চেয়েও ভালো কাজ করে।
‘ফিটকিরির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বিষক্রিয়া ও স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে সজনে বীজে বিষক্রিয়া ঝুঁকি কম এবং বেশি বর্জ্যও তৈরি করে না,’ যোগ করেন আদ্রিয়ানো।
ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন দুটি উপকারিতার কথা তুলে ধরেন। তবে তিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না।
ম্যাথিউ বলেন, অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টারের বদলে সজনে বীজের ব্যবহার পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে। এতে অ্যালুমিনিয়াম খননের প্রয়োজনীয়তা কমবে এবং পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে।
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটি সজনে বীজ প্রায় ১০ লিটার পানি বিশুদ্ধ করতে পারে।
আদ্রিয়ানো বলেন, ‘এটি আশাব্যঞ্জক হলেও বড় শহরের উচ্চ প্রবাহের পানি শোধনাগারে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হবে।’ আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো, বেশি বীজ ব্যবহার করলে পানিতে বেশি জৈব অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, যা পরে অপসারণ করতে হবে।
অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন মনে করেন, সজনে বীজের নির্যাস কীভাবে কাজ করে এবং এই পদ্ধতিতে কত বড় পরিসরে সাশ্রয়ীভাবে পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব, তা বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। অন্যান্য মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও সজনে কাজ করে কি না, তা জানাও অত্যন্ত জরুরি।
ন্যানোপ্লাস্টিক হলো মানুষের চুলের গড় প্রস্থের প্রায় এক-হাজার ভাগের এক ভাগ, যা মানবদেহে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
সজনে বীজ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক অপসারণে কার্যকর হবে বলে আশাবাদী আদ্রিয়ানো। তিনি জানিয়েছেন, তার দল এ নিয়ে আরও গবেষণা করবে।
অধ্যাপক ম্যাথিউ বলেন, ‘মানবজাতি ক্রমবর্ধমান হারে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে এবং আগামী বহু দশকেও এই প্রবণতা কমার সম্ভাবনা নেই। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এখন অত্যন্ত জরুরি।’