‘বেড পাইনি তাতে কী, ছেলের চিকিৎসা তো পেয়েছি’
বাড়ির সামনের রাস্তায় হাঁটার সময় হঠাৎ একটি গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। ঘটনাস্থলেই সে জ্ঞান হারায়। ঈদের মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ছেলের এমন অবস্থায় বিপাকে পড়ে যান শ্রমিক কামাল হোসেন।
মেহেদীকে সেদিনই নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির কাছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার স্থানীয় একটি হাসপাতালে। তারপর সেখান থেকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে।
সিটি স্ক্যান করে দেখা যায়, মেহেদীর মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। জরুরিভিত্তিতে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের কাছে র্যাম্পে ঠাঁই হয়েছে তার।
শুধু মেহেদী নয়, তার মতো আরও কয়েকশ মানুষ ঢামেক হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। বেড না পেয়ে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা, সিঁড়ির পাশে, এমনকি র্যাম্পে অবস্থান করছে।
বিভাগটিতে কর্মরত একাধিক নার্সের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হাসপাতালে সব মিলিয়ে বেড আছে ২ হাজার ৬০০। প্রায় সারা বছরই বেড সংখ্যার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে, কখনো কখনো তারও বেশি। এখন ঈদের সময় রোগী কম। প্রায় ২ হাজার ২৫০ জনের মতো রোগী বিভিন্ন বিভাগের অধীনে ভর্তি রয়েছেন।
কিন্তু, নিউরো সার্জারি বিভাগে রোগীর উপচে পড়া ভিড়।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নিউরো সার্জারি বিভাগে বেড আছে ৩০০টি। কিন্তু, এই বিভাগে সব সময় ৫০০ জনের বেশি রোগী থাকে। ঈদের সময় অন্যান্য বিভাগে রোগী কম হলেও নিউরোতে রোগীর চাপ প্রায় একই রয়েছে।’
তিনি জানান, দেশের সব হাসপাতালে নিউরো চিকিৎসার সুযোগ অনেক বেশি না থাকায় এবং গুরুতর রোগী ঢামেকে রেফার্ড করায় এখানে সব সময় চাপ বেশি থাকে।
এমন পরিস্থিতির কারণেই মেহেদীদের জায়গা করে নিতে হয়েছে র্যাম্পে।
মেহেদীর বাবা কামাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার ছেলের অপারেশন হয়ে গেছে। জমাট বাঁধা রক্ত বের করেছে। মাথায় একটা পাইপও লাগিয়ে (ড্রেন করে) দিয়েছে। আরও দূষিত রক্ত বের হয়ে যাচ্ছে।’
হাসপাতালে বেড না পাওয়ায় কামালের কিছুটা খারাপ লাগা থাকলেও তিনি খুশি যথাযথ চিকিৎসা পেয়ে। বলেন, ‘বেড পাইনি তাতে কী, ছেলের চিকিৎসা তো পেয়েছি।’
স্ত্রী পারুল বেগমকে নিয়ে গত সাত দিন ধরে এভাবেই ছেলের দেখভাল করছেন কামাল। ঈদের দিনটাও কেটেছে হাসপাতালেই।
ঢামেক পরিচালক জানান, ঈদের ছুটিতে নিয়মিত পদ্ধতিতেই চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা রোস্টার অনুযায়ী সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে যা আছে, তা দিয়েই সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করি। এখানে প্রচুর রোগী আসেন এবং সেই তুলনায় আমাদের বেড সংখ্যা কম। আমরা প্রতিটি রোগীর চিকিৎসার বিষয়ে ফোকাস করি।’
তিনি বলেন, ‘এখানে আসা রোগীদের মধ্যে ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যাই বেশি। কাউকে আমরা ফেরত দিতে পারি না। আমরা শুধু নিশ্চিত করি, প্রতিটি রোগী যেন সুচিকিৎসা পায় এবং কাউকে যেন বিনা চিকিৎসায় ফিরতে না হয়।’