ইরান যুদ্ধে যেভাবে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও পাল্টা হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত বেসামরিক মানুষ। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘাতে ঘরছাড়া হয়েছে আরও কয়েক লাখ মানুষ। বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এই যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।
তবে অন্তত একটি দেশের জন্য এই বিশৃঙ্খলা নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম সপ্তাহ শেষে রাশিয়া প্রাথমিক বিজয়ী হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যরা এই যুদ্ধের খরচ বহন করছে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে মস্কো।
ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা কয়েকটি দেশের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে একে ‘একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও উসকানিবিহীন সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে।
একইভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ‘নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড’ বলে সমালোচনা করেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অঞ্চলটিতে শক্তিশালী মিত্র হারানোর ঝুঁকি থাকলেও স্বল্পমেয়াদে মস্কো এর থেকে লাভবানও হতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের ননরেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো রবার্ট পারসন টাইমকে বলেন, ‘আমরা এখন যা দেখছি তা অনুমান করা কঠিন ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘পুতিন ও তার উপদেষ্টারা সম্ভবত মনে করেছেন, ইরানে যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার উপকারে আসবে।’
জ্বালানির উচ্চ মূল্য আর ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ সরে যাওয়া সেই রাশিয়াকে বাড়তি সুবিধা দেবে বলে মনে করেন তিনি। এমনিতেও পুতিন এখনই রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী নন। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যীয় সংঘাতে জড়িয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
রবার্ট পারসন বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব বিষয় কতটা প্রভাব ফেলেছে আমরা জানি না। তবে আমার ধারণা এগুলো অগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার মধ্যে ছিল।’
ইরান যুদ্ধ থেকে রাশিয়া যেসব উপায়ে লাভবান হতে পারে তা তুলে ধরা হলো।
রুশ তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ জব্দ, তেলের মূল্যসীমা নির্ধারণসহ নানা অর্থনৈতিক চাপ। এগুলোর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ পরিচালনার অর্থ জোগান ঠেকানো।
গত আগস্টে রুশ তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। তার যুক্তি ছিল, ভারত এই তেল কিনতে থাকায় ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনকে আলোচনায় আনা যাচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ সপ্তাহে ওই শুল্কের ওপর ৩০ দিনের ছাড় ঘোষণা করেছেন। আরও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয় বিবেচনা করছেন।
শুক্রবার ফক্স বিজনেসকে বেসেন্ট বলেন, ‘আমাদের মিত্র ভারত ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা রুশ তেল কিনতে পারবে। তবে আমরা অন্যদেশে রুশ তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারি।’
বৃহস্পতিবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বেসেন্ট আরও বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে স্বল্পমেয়াদি এই ব্যবস্থা রুশ সরকারকে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা দেবে না। কারণ এটি কেবল সমুদ্রে আটকে থাকা তেলসংক্রান্ত লেনদেনের অনুমতি।’
তবুও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের দাবি, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রুশ জ্বালানি পণ্যের চাহিদায় ‘উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ ঘটেছে।
তেলের দাম বৃদ্ধি
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল রাশিয়ার ওপর। সেইসঙ্গে তেলের দামও ছিল কম। এই দুটির সমন্বয়ে রাশিয়ার জ্বালানি শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখাচ্ছিল।
টাইম জানায়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে ইউক্রেনে যুদ্ধে মস্কোর আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে, রাশিয়ার ফেডারেল বাজেটে তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমেছে। আর প্রতিনিয়ত হু হু করে দামও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি লাভবান হওয়ার মতো কয়েকটি তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে একটি রাশিয়া।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আগে রাশিয়াকে প্রতি ব্যারেল তেল ১০ থেকে ১৩ ডলার কম দামে বিক্রি করতে হতো। কিন্তু এখন তারা প্রতি ব্যারেল চার থেকে পাঁচ ডলার বেশি দামে বিক্রি করছে।
তেলের উচ্চ মূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন—এই দুইয়ের সমন্বয় বড় ধরনের আর্থিক লাভ বয়ে আনতে পারে মস্কোর জন্য। অথচ মাত্র এক বছর আগে তাদের তেল ও গ্যাসখাতে আয় ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল।
ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা
ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করার সক্ষমতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে টাইম। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মনযোগ সরে যাওয়ায় মস্কো লাভবান হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইউক্রেন। তারা আগেই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির মধ্যে ছিল। বিশেষ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাম ইউনিট প্রতি প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
এখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতেও একই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবহার করছে। সুতরাং ইউক্রেনে যোগান কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ কমিশনার আন্দ্রিয়ুস কুবিলিয়ুস শুক্রবার বলেন, ইউক্রেনের পরিস্থিতি ‘সংকটজনক’ এবং ইইউকে ‘অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে হবে।’
কুবিলিয়ুস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের, মধ্যপ্রাচ্যের এবং ইউক্রেনের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে সরবরাহ করতে পারবে না।’
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানায়, শনিবার রাতভর ইউক্রেনের খারকিভ শহরে রাশিয়া অন্তত ৪৫০টি ড্রোন ও ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হন। এ ঘটনা আকাশপথে হামলায় ইউক্রেনের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের থেকে যেকোনো মাসের তুলনায় এ বছর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এএফপি জানায়, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ২৮৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইউক্রেনে। জানুয়ারিউতে ছুড়েছিল ১৩৫টি। অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিমাণ প্রায় ১১৩ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে ধুকতে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করতে তাদের নিজস্ব সস্তা ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি দিয়ে ইউক্রেন সহায়তা করবে।
বৃহস্পতিবার এক্সে জেলেনস্কি বলেন, ‘ইরানের ড্রোন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় নির্দিষ্ট সহায়তার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুরোধ পেয়েছি।’
তিনি জানান, ‘ইউক্রেনীয় উপদেষ্টা ও প্রযুক্তি শিগগিরই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হবে। যারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, আমরাও তাদের সহায়তা করি।’
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ইরানে তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে রাশিয়া। মূলত বাধ্য হয়ে ইউক্রেন ‘স্টিং’ নামে সস্তা ড্রোন তৈরি করেছে। এগুলো পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ করে শাহেদ ড্রোনের সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
‘যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন দুর্বল করে দেওয়া’
ওয়াশিংটন পোস্ট ও এপিসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাশিয়া মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্পর্কে লক্ষ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে ইরানকে। আবার সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে নির্দেশনাও দিচ্ছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য পোস্ট জানায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সম্পদের অবস্থান সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে—এ কথা অস্বীকার করেননি। তবে তারা এর প্রভাব ও সামরিক অভিযানে ক্ষতি করার সক্ষমতাকে খাটো করে দেখিয়েছেন।
সিবিএস নিউজ রাশিয়ার তথ্য কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করতে ইরানকে সহায়তা করেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘কেউ আমাদের বিপদে ফেলছে না।’
পেন্টাগন প্রধান আরও বলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা এর মোকাবিলা করছি। আমাদের কমান্ডাররা এসব বিষয় বিবেচনায় রাখেন। তবে এখন ইরানিদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, যারা মনে করছে তারা বেঁচে থাকবে।’
এ সপ্তাহের শুরুতে ফক্স নিউজের প্রতিবেদক পিটার ডুসি ইরানকে রাশিয়ার সহায়তার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বিরক্ত হয়ে ওঠেন।
ট্রাম্প ডুসিকে বলেন, ‘আমি আপনাকে অনেক সম্মান করি, আপনি সবসময় আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই সময়ে এমন প্রশ্ন করা বোকামি। আমরা এখন অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলছি।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো পারসন টাইমকে বলেন, ইরানকে সহায়তা করার রুশ প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় পরিকল্পনার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনকে জটিল বা দুর্বল করে দেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপই আপেক্ষিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে মস্কোর পক্ষে নিয়ে যায়।


