খারগ দ্বীপকে ইরানের লাইফলাইন বলা হয় কেন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের তেলকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা হামলার একটি বলে উল্লেখ করেছেন। হামলার পর তিনি দাবি করেছেন, খারগ দ্বীপে সামরিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, তারাও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তেল ও জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস করে দেবে।

ট্রাম্পের কথায় জানা গেছে, আপাতত দ্বীপটির তেল অবকাঠামোর ওপর কোনো হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।

অপরদিকে ইরানি সেনাবাহিনীর আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে এবং তা ছাইয়ের স্তূপে পরিণত করা হবে।

ইরানের দ্বীপ কয়টি

ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ১০০টিরও বেশি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ হলো—

কেশম ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ, কিশ পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্র, খারগ প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র, আবু মুসা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ এবং হরমুজ দ্বীপ হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত।

এসব দ্বীপের অনেকগুলোতেই সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো বা বাণিজ্যিক বন্দর রয়েছে। পারস্য উপসাগরে তেল পরিবহন ও সামরিক কৌশলের দিক থেকে এগুলোর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

 

খারগ দ্বীপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পারস্য উপসাগরে ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপ। আয়তনে ছোট হলেও এটি ইরানের জ্বালানি খাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এই দ্বীপে রয়েছে—বিশাল তেল সংরক্ষণ ট্যাংক, একাধিক তেল লোডিং টার্মিনাল, বড় বড় তেলবাহী ট্যাংকারের জেটি ও পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে আসা তেলের মজুত।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে খারগ দ্বীপের টার্মিনাল থেকেই বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়।

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’

ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে খারগ দ্বীপ কার্যত দেশটির জ্বালানি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

কেননা ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশ এখান থেকেই হয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস এটি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এখান থেকে তেল পাঠানোর ব্যবস্থা বজায় থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি খারগ দ্বীপের কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ইরানের তেল রপ্তানি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

অতীতের যুদ্ধেও ছিল প্রধান লক্ষ্য

ইরান–ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮) চলাকালে খারগ দ্বীপ ছিল ইরাকি বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ওই সময় দ্বীপটির তেল স্থাপনায় বহুবার বিমান হামলা চালানো হয়।

তারপরও ইরান দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন করে তেল রপ্তানি চালু রাখে।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আঞ্চলিক সংঘাত আরও বাড়তে থাকলে খারগ দ্বীপ আবারও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব

খারগ দ্বীপ শুধু ইরানের জন্যই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ—এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়, পারস্য উপসাগরের তেল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় কেন্দ্র এটি এবং এই দ্বীপের কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।

আয়তনে ছোট হলেও খারগ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশ এখান থেকে হওয়ায় এটি কেবল একটি দ্বীপ নয়—বরং ইরানের অর্থনীতির প্রধান ধমনী হিসেবে বিবেচিত।

এই কারণেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা খারগ দ্বীপকে প্রায়ই ইরানের ‘লাইফলাইন’ বলে উল্লেখ করেন।