বিশ্লেষণ

ব্রিটেনের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম কেমন হবেন, আদৌ কি টিকতে পারবেন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। আর ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়ির পরবর্তী বাসিন্দা হিসেবে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে একটাই নাম, অ্যান্ডি বার্নাম।

প্রায় এক দশক ধরে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র ছিলেন। সম্প্রতি মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি আবার ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে এসেছেন। এই ফেরা শুধু একজন রাজনীতিবিদের ফেরা নয়। এটি ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিতও।

তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নাম কেমন হবেন? তার নীতিগুলো কী? আর ব্রিটেনের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন কি না?

অ্যান্ডি বার্নাম। ছবি: রয়টার্স

কে এই অ্যান্ডি বার্নাম?

অ্যান্ডি বার্নামের গল্প শুরু হয় লিভারপুলে। ১৯৭০ সালে জন্ম তার। বড় হয়েছেন চেশায়ারের ছোট্ট এক গ্রাম কালচেথে।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, তার বাবা ব্রিটিশ টেলিকমে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আর মা রিসেপশনিস্ট। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি বিবিসির একটি নাটক দেখে রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নাটকটির নাম ‘বয়েজ ফ্রম দ্য ব্ল্যাকস্টাফ’, যা লিভারপুলের বেকারত্ব নিয়ে তৈরি।

এই নাটক দেখেই তিনি লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।

রাজনীতিতে তার উত্থান হয়েছিল খুব দ্রুত। ২০০১ সালে লেই আসন থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের সরকারে সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। তবে তার পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না।

২০১০ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে তিনি হেরে যান এড মিলিব্যান্ডের কাছে। ২০১৫ সালে আবার হারেন, এবার জেরেমি করবিনের কাছে।

এরপর তিনি ওয়েস্টমিনস্টার ছেড়ে দেন। ২০১৭ সালে হন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। এর পরেই আসে কোভিড-১৯ মহামারি। লকডাউন নীতি নিয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়ান বার্নাম। এই লড়াই তাকে রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত করে। মানুষ তাকে ডাকতে শুরু করে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বা উত্তরের রাজা নামে।

পিপলস হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বক্তৃতা দিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নাম। ছবি: রয়টার্স

বার্নামের রাজনৈতিক দর্শন: ‘ম্যানচেস্টারিজম’

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যান্ডি বার্নামের রাজনৈতিক দর্শনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যানচেস্টারিজম’। সহজ কথায়, এটি একধরনের ব্যবসাবান্ধব সমাজতন্ত্র। এখানে অর্থনীতিতে লাগামহীন বেসরকারিকরণের বদলে গুরুত্ব পায় জনকল্যাণ।

বার্নামের মতে, এখনকার ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শুধু সরকার বদলালেই চলবে না। বদলাতে হবে দেশ চালানোর পুরো পদ্ধতি।

ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।

তিনি মনে করেন, ব্রিটেন পৃথিবীর সবচেয়ে কেন্দ্রীভূত দেশগুলোর একটি। এখানে সব ক্ষমতা জমা হয়ে আছে লন্ডনে। এই অবস্থা বদলাতে তিনি ম্যানচেস্টারে একটি নতুন স্নায়ুকেন্দ্র গড়তে চান, নাম দিয়েছেন ‘নম্বর টেন নর্থ’। এই কেন্দ্রের কাজ হবে হোয়াইটহল থেকে ক্ষমতা ও সম্পদ পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।

জার্মানির সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি চান, দেশের সব অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান যেন সমান হয়।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে হাউস অব কমন্সে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মাথা নত করছেন মেকারফিল্ড আসনের নবনির্বাচিত ব্রিটিশ সংসদ সদস্য (এমপি) অ্যান্ডি বার্নাম। ছবি: রয়টার্স

অর্থনীতি, আবাসন ও জনসেবা নিয়ে বার্নামের পরিকল্পনা

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হলে বার্নাম আশির দশকের পুরোনো ‘ট্রিকল-ডাউন অর্থনীতি’ থেকে সরে আসতে চান। তার পরিকল্পনায় যা যা আছে, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।

জনসেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ

বার্নাম চান পানি, জ্বালানি, পরিবহন আর আবাসনের মতো মৌলিক পরিষেবাগুলো থাকুক জনগণের বেশি নিয়ন্ত্রণে।

বিবিসি জানায়, ম্যানচেস্টারে তিনি ইতিমধ্যে এমন একটি কাজ করে দেখিয়েছেন। বাস পরিষেবা পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে চালু করেছেন ‘বি নেটওয়ার্ক’, যা সফল হয়েছে।

তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এর মানে এই নয় যে সব কোম্পানি রাতারাতি জাতীয়করণ হয়ে যাবে। কারণ তাতে খরচ হবে কোটি কোটি পাউন্ড, যা রাষ্ট্রের পক্ষে সামলানো কঠিন।

আবাসন বিপ্লব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সরকারি আবাসন প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বার্নাম। গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশক থেকে ব্রিটেন প্রায় ১৫ লাখ কাউন্সিল হোম হারিয়েছে। এর ফলেই আবাসন সংকট এখন চরমে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে ঘুমিয়ে আছে ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত বিড়াল ‘ল্যারি’। ছবি: রয়টার্স

ক্ষুদ্র ব্যবসা ও হাই স্ট্রিট বাঁচানো

অ্যামাজনের মতো বড় অনলাইন রিটেইলারের গুদামের ওপর কর বাড়াতে চান তিনি। বিপরীতে পাব আর স্থানীয় মিউজিক ভেন্যুর জন্য বিজনেস রেট ২০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। লক্ষ্য একটাই, শহরের প্রাণকেন্দ্র বা ‘হাই স্ট্রিটগুলোকে’ আবার জাগিয়ে তোলা।

কর ব্যবস্থা ও সমাজকল্যাণ

লেবার পার্টির আগের প্রতিশ্রুতি মেনে আয়কর, ভ্যাট আর ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের মূল হার বাড়াবেন না বার্নাম। তবে কাউন্সিল ট্যাক্স আর স্ট্যাম্প ডিউটি তুলে দিয়ে জমির মূল্যের ওপর নতুন কর বসাতে চান তিনি।

আর সামাজিক সুরক্ষার জন্য উত্তরাধিকার কর বাতিল করে একটি নতুন ‘ন্যাশনাল কেয়ার লেভি’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।

পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসন

দেশের ভেতরের রাজনীতিতে বার্নাম যতটা স্পষ্টবাদী, পররাষ্ট্রনীতিতে তাকে ততটাই কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে।

তিনি বলেছেন, জীবদ্দশায় তিনি যুক্তরাজ্যকে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে দেখতে চান।

তবে ২০১৬ সালের মতো নতুন কোনো গণভোটের পক্ষে তিনি এখনই নন বলে জানায় বিবিসি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও তার অবস্থান স্পষ্ট, ভালো সম্পর্ক রাখবেন, তবে দরকার হলে দ্বিমত জানাতেও পিছপা হবেন না।

অভিবাসনের ক্ষেত্রে তিনি বর্তমান সরকারের মতোই নিট মাইগ্রেশন কমাতে চান। তবে দলের এমপিদের তিনি সতর্ক করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা ব্রিটেনে বসবাস করছেন, তাদের স্থায়ী হওয়ার সুযোগের ক্ষেত্রে যেন বাড়াবাড়ি না করা হয়।

লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ম্যানচেস্টার পিকাডিলি রেলস্টেশনে নবনির্বাচিত মেকারফিল্ড আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নাম। ছবি: রয়টার্স

বার্নাম কি টিকে থাকতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসা যতটা সহজ মনে হচ্ছে, সেই চেয়ারে টিকে থাকা তার চেয়ে অনেক কঠিন হতে পারে বার্নামের জন্য। গত ১৫ বছরেই ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী বদলেছে ছয়জন। তাই তার সামনে অপেক্ষা করছে বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও অর্থায়ন

বার্নাম একদিকে বিশাল আবাসন প্রকল্প আর জনসেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণের মতো বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আবার অন্যদিকে তিনি সরকারের কঠোর ঋণ ও ব্যয়ের নিয়মও মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বন্ড মার্কেটকে চটাতেও চান না তিনি।

তাহলে এই সীমিত বাজেটে এত বড় পরিকল্পনার টাকা আসবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ছবি: রয়টার্স

দলের ভেতরের বিভক্তি ও ‘ওয়েদার ভেন’ অপবাদ

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সমালোচকরা বার্নামকে ডাকেন ‘ওয়েদার ভেন’ বা সুবিধাবাদী বলে।

তাদের অভিযোগ, রাজনীতির হাওয়া যেদিকে বয়, বার্নামও সেদিকে নিজের অবস্থান বদলান। বন্ড মার্কেট, ইইউ সদস্যপদ কিংবা অভিবাসন নীতি, প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান বদলাতে দেখা গেছে আগে।

এদিকে লেবার পার্টির ভেতরে তিনি পরিচিত মধ্য-বামপন্থি নেতা হিসেবে। কিন্তু ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকাতে গিয়ে তিনি নিজে কতটা সরে যাবেন তার মূল অবস্থান থেকে, এই নিয়ে দলের ভেতরেই দুশ্চিন্তা আছে।

ওয়েস্টমিনস্টার ও হোয়াইটহলের প্রতিরোধ

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্নাম সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন হোয়াইটহলের বিরুদ্ধে। হোয়াইটহল মূলত ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের প্রতীকী নাম।

তিনি বলেছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় একে অপরের সঙ্গে লড়াই করার দিন শেষ হওয়া উচিত। এমপিদের ওপর থাকা হুইপ ব্যবস্থার ভয় কাটিয়ে তাদের আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চান তিনি।

তবে কথা হলো, ব্রিটেনের পুরোনো আমলাতন্ত্র বা ‘ডিপ স্টেট’ এত সহজে বদলাবে না। তাই এই লড়াই সহজ হবে না বার্নামের জন্য।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পার্লামেন্ট ভবনের ওয়েস্টমিনস্টার হলে প্রবেশের সময় অ্যান্ডি বার্নামকে দেখে উপস্থিত মানুষের প্রতিক্রিয়া। ছবি: রয়টার্স।

রিফর্ম ইউকে এবং ডানপন্থিদের চ্যালেঞ্জ

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বার্নাম পেয়েছেন ৫৫ শতাংশ ভোট। তিনি হারিয়েছেন রিফর্ম ইউকে আর আরেকটি ডানপন্থি দল রিস্টোর ব্রিটেনকে। রিফর্ম ইউকে পেয়েছিল ৩৫ শতাংশ ভোট।

এই ফল বলে দেয়, শ্রমিক শ্রেণির ভোট আবার লেবার পার্টির দিকে টানতে পারেন বার্নাম। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম পার্টিকে মোকাবিলা করা তার জন্য সহজ কোনো কাজ হবে না।

অ্যান্ডি বার্নাম এমন এক সময়ে ডাউনিং স্ট্রিটের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত রাজনীতির ওপর বিরক্ত। তিনি মানুষকে দেখাচ্ছেন নতুন এক স্বপ্ন। তার ‘ম্যানচেস্টারিজম’ মডেল যদি সত্যিই কাজে লাগে, তাহলে ব্রিটেনের আঞ্চলিক বৈষম্য কমে গিয়ে নতুন এক যুগ শুরু হতে পারে।

কিন্তু শুধু আবেগ আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশ চালানো যায় না। তাকে একসঙ্গে সামলাতে হবে অর্থনীতি, মেটাতে হবে দলের ভেতরের কোন্দল আর বুঝতে হবে বৈশ্বিক কূটনীতির জটিল হিসাব।

অ্যান্ডি বার্নাম যদি তার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে ঠিক ভারসাম্য খুঁজে পান, তাহলে তিনি শুধু টিকেই থাকবেন না, হয়ে উঠতে পারেন আধুনিক ব্রিটেনের ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী।

আর যদি তার বিশাল প্রতিশ্রুতিগুলোর জন্য টাকার জোগান দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার পরিণতিও হতে পারে আগের প্রধানমন্ত্রীদের মতোই হতাশাজনক।