৫০ বছরেরও বেশি সময় পর চাঁদের উদ্দেশে নভোচারী পাঠাল নাসা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে চার নভোচারীকে নিয়ে মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছে ‘আর্টেমিস টু’ মিশনের রকেট। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এই ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমেই মানুষ পুনরায় পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের সীমানা অতিক্রম করল। আল জাজিরার খবরে এমনটি জানানো হয়েছে।

বুধবার শুরু হওয়া এই মিশনটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ। তাদের মূল লক্ষ্য হলো চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানো এবং পর্যায়ক্রমে মঙ্গল গ্রহেও নভোচারী পাঠানোর পথ প্রশস্ত করা।

‘আর্টেমিস টু’ দলের চার সদস্য হলেন— নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডীয় মহাকাশ সংস্থার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে তারা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। গত কয়েক দশকের তুলনায় এই যাত্রায় তারা মহাকাশের অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবেন।

উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক অভিযানে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস দলের ভালোবাসা, আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের অদম্য সাহস এবং একটি নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। আপনাদের মঙ্গল হোক, সফল হোক আর্টেমিস টু। এবার এগিয়ে যান।’

মহাকাশযাত্রা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় মিশনের কমান্ডার ওয়াইজম্যান তাদের লক্ষ্যস্থল দেখতে পান। মহাকাশযানের ক্যাপসুল থেকে তিনি বলেন, ‘আমরা এক চমৎকার চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছি, আমরা ঠিক সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি।’

উৎক্ষেপণের আগে কয়েক ঘণ্টা ছিল চরম উত্তেজনাকর

উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে টানটান উত্তেজনা কাজ করছিল, বিশেষ করে যখন রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি ঢোকানো শুরু হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি নিয়েই সবার দুশ্চিন্তা ছিল, কারণ চলতি বছরের শুরুর দিকে এক পরীক্ষায় এখান থেকেই জ্বালানি লিক হওয়ার ফলে পুরো মিশনটি পিছিয়ে গিয়েছিল।

নাসার জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, এবার কোনো উল্লেখযোগ্য হাইড্রোজেন লিক ধরা পড়েনি। উৎক্ষেপণকারী দলটি সফলভাবে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটে সাত লাখ গ্যালনেরও বেশি (২ দশমিক ৬ মিলিয়ন লিটার) জ্বালানি ভরেছে। এই নির্বিঘ্ন প্রক্রিয়াটি আর্টেমিস টু-এর নভোচারীদের মহাকাশযানে আরোহণের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

উৎক্ষেপণের ঠিক আগ মুহূর্তে কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিলেও নাসা সময়মতো সেগুলো সমাধান করে ফেলে, যার ফলে যাত্রায় কোনো দেরি হয়নি। একটি বিশেষ সমস্যা ছিল রকেটের ফ্লাইট-টারমিনেশন ব্যবস্থার কমান্ড না পৌঁছানো। এই ব্যবস্থার কাজ হলো—রকেট যদি ভুল পথে গিয়ে কোনো লোকালয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে, তবে সেটিকে আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া।

নাসা জানায়, সেই সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রকৌশলীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘লঞ্চ-অ্যাবোর্ট সিস্টেম’-এর একটি ব্যাটারির ত্রুটিও সারিয়ে ফেলেন, যার তাপমাত্রার রিডিং প্রত্যাশিত মাত্রার বাইরে চলে গিয়েছিল। তবে সমস্যাটি দ্রুত মিটে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তা উৎক্ষেপণে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি।

এরপর কী হতে যাচ্ছে?

প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানের বিভিন্ন ব্যবস্থার ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে ওরিয়ন যানের জীবন-রক্ষাকারী ব্যবস্থা, প্রপালশন, নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে, যেন মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে ভ্রমণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হলে ওরিয়ন ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন চালনা (ইঞ্জিন বার্ন) সম্পন্ন করবে। এর মাধ্যমেই মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের অভিমুখে নির্দিষ্ট পথে যাত্রা শুরু করবে।

চাঁদের দিকে এই যাত্রায় কয়েক দিন সময় লাগবে। পৃথিবী থেকে ক্রমে দূরে সরে যাওয়ার এই পুরো সময়জুড়ে নভোচারীরা মহাকাশযানের প্রতিটি ব্যবস্থার ওপর নিবিড় নজরদারি রাখবেন।

এরপর ওরিয়ন ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি’ অনুসরণ করে চাঁদের পিছন দিক দিয়ে উড়ে যাবে। এই বিশেষ পথটি মূলত চাঁদ ও পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ব্যবহার করে খুব সামান্য জ্বালানি ব্যয়ে মহাকাশযানটিকে প্রাকৃতিকভাবেই পুনরায় পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আনবে। এই পর্যায়েই মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে তার সর্বোচ্চ দূরত্বে অবস্থান করবে।

চাঁদ প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীতে ফেরার পথে নভোচারীরা আরও কয়েক দিন সময় কাটাবেন। এ সময় তারা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রু পরিচালনার ওপর আরও কিছু গভীর মহাকাশ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন।

পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এরপর এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে, যেখান থেকে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।

নাসার অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যখন শেষবার চাঁদে হেঁটেছিলেন, বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশির তখন জন্ম হয়নি। তাই আর্টেমিসকে নতুন প্রজন্মের চন্দ্রাভিযান হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।

নাসার সায়েন্স মিশন প্রধান নিকি ফক্স চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন, ‘এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের অ্যাপোলো অভিযানের কথা মনে নেই। এমন অনেক প্রজন্ম রয়েছে যারা অ্যাপোলোর সময় পৃথিবীতেই ছিল না। এটিই তাদের সময়ের অ্যাপোলো।’