ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আরও ৩ সপ্তাহ বাড়ছে: ট্রাম্প
ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, হিজবুল্লাহর প্রভাব থেকে লেবাননকে সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পাশে থেকে কাজ করে যাবে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনার প্রেক্ষিতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, যার সময়সীমা আগামী রোববার শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই আলোচনার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সাত সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা লড়াইয়ের অবসান ঘটানো।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প জানান, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুজনেই ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে’ হোয়াইট হাউস সফর করবেন।
তিনি বলেন, ‘হিজবুল্লাহর বিষয়টি তাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা লেবাননের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে যাচ্ছি।’
‘ইরান ইস্যুতে আমাদের পদক্ষেপের সঙ্গে সাথে যদি এই সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব হয়, তবে সেটি হবে দারুণ বিষয়।’
ওভাল অফিসে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াদ এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লিটার এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল উভয়পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে যখন আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই হিজবুল্লাহ জানায় যে তারা উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ পাল্টা জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে গোষ্ঠীটি দাবি করে। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তারা রকেটগুলো মাঝপথেই প্রতিহত করেছে।
এর আগে বুধবার, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন সাংবাদিক নিহত এবং অন্য একজন আহত হওয়ার পর লেবানন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে। তবে আইডিএফ সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
বৃহস্পতিবারের আলোচনার আগে ইসরায়েল জানিয়েছিল যে লেবাননের সঙ্গে তাদের কোনো ‘বড় কোনো মতপার্থক্য’ নেই। তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননকে ‘একত্রে কাজ করার’ আহ্বান জানায়।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে প্রথম দফায় আলোচনায় বসেন লেবানন ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিরা। এর মধ্য দিয়ে তিন দশকে প্রথমবার দেশ দুটির মধ্যে সরাসরি ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ আগের সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তুলে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু ও ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করার পর প্রতিশোধ নিতে ২ মার্চ ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বৈরুতে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। মার্চের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) পুনরায় দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশ করে এবং বর্তমানে তারা দেশটির ১০ কিলোমিটার (৬.২ মাইল) ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে অন্তত দুই হাজার ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানে বেসামরিক নাগরিক এবং যোদ্ধাদের আলাদা করা হয়নি। নিহতদের মধ্যে ২৭৪ জন নারী এবং ১৭৭ শিশু রয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলে দুইজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন এবং লেবাননে সরাসরি যুদ্ধে ১৫ জন ইসরায়েলি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে লেবাননজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এদের অধিকাংশই দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা, যেখানে ইসরায়েলি হামলায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ও গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহ হলো লেবাননের একটি শিয়া মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং একটি রাজনৈতিক দল।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ অনেক লেবানিজ নাগরিকেরও দাবি—হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ। কিন্তু হিজবুল্লাহ এখন পর্যন্ত তাদের অস্ত্রশস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট আউন বলেছেন যে বলপ্রয়োগ করে নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়। তিনি আরও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই সমস্যার সমাধানের জন্য হিজবুল্লাহর সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হবে।
হিজবুল্লাহ সমর্থকদের দাবি, এই দুর্বল রাষ্ট্রে তাদের একমাত্র সুরক্ষা হলো এই গোষ্ঠীটি। আর আপাতত হিজবুল্লাহ তাদের সমরাস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো কথা বলতে নারাজ।