কীভাবে ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে ইরান, কোথায় সেই মজুত?
আট বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার পর থেকে তেহরান প্রায় ২২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে।
তেহরান যেন এই ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে, সেটাকেই কারণ হিসেবে দেখিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে হামলা শুরু করে।
হামলা শুরুর পর প্রায় দুইমাস কেটে গেলও এই রহস্য উন্মোচন হয়নি যে, ইরানের সেই বিশাল ইউরেনিয়ামের মজুত কোথায়। যদিও জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা আইএইএ রাফায়েল গ্রসির মতে, ইরানের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ সম্ভবত ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সে রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস ও এবিসির এক প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে, ইরান কীভাবে এত ইউরেনিয়াম জমা করেছে এবং এখন সেগুলো কোথায় থাকতে পারে।
ইরানের মজুতে ঘনত্বের মাত্রা
ইউরেনিয়াম যত বেশি সমৃদ্ধ হয়, তত দ্রুত ও সহজে আরও উচ্চমাত্রায় নেওয়া যায়। শূন্য থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানো কঠিন, কিন্তু ২০ থেকে ৬০ বা ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের টাইমলাইন
২০০৬
ইরান ২০০৬ সালে শিল্পপর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে এবং তা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে বলে দাবি করে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিবেদনে পরবর্তী বছরগুলোতে মজুত দ্রুত বাড়তে দেখা যায়।
২০১০
২০১০ সালে ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ঘোষণা দেয়, যা গবেষণা রিয়্যাক্টরের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কথা জানায়।
এই মাত্রা বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের সীমারেখা হিসেবে ধরা হয়। ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ করা মানে একটি পারমাণবিক বোমার জ্বালানি তৈরি প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা।
২০১৫
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি দেশের সঙ্গে ইরান চুক্তি করে, যেখানে ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও মজুত ৬৬০ পাউন্ডের নিচে রাখার শর্ত ছিল। চুক্তির অধীনে ইরান ২৫ হাজার পাউন্ড বা সাড়ে ১২ টন ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠায়।
২০১৮
২০১৮ সালে ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে ইরান ধীরে ধীরে আবার ইউরেনিয়াম মজুত ও সমৃদ্ধকরণ বাড়াতে শুরু করে। প্রথমে কম মাত্রায়, পরে ২০২১ সালের শুরুতে ২০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
বাইডেন প্রশাসন সেই চুক্তি পুনরায় করার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। এ সময় ইরান সমৃদ্ধির মাত্রা বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে নিয়ে যায়, যা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার একেবারে কাছাকাছি।
২০২৫
২০২৫ সালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসার পর ইরান ইউরেনিয়াম মজুত দ্রুত বাড়তে থাকে। আইএইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিহাসের দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ।
যুদ্ধের প্রভাব
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদোর সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং ইসফাহানের ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ টানেলে বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর এক মাস পর আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় ইরান। ফলে, পরিদর্শকরাও আর পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি।
বর্তমানে পরিদর্শন বন্ধ থাকায় ইরানের হাতে থাকা ১১ টন ইউরেনিয়াম ঠিক কোথায় আছে, তা নিশ্চিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল এই মজুতের একাংশ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। সেটা উদ্ধার করা বা এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। ইরান যদি ইউরেনিয়াম খনন করে বেরও করে, সেটা থেকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় ইরান কোনো হুমকি ছিল না। কারণ, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে দেশটি তখনও বহু বছর দূরে ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন যা বলছে
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, মার্কিন স্যাটেলাইটগুলো মাটির গভীরে থাকা এই ইউরেনিয়ামের ওপর নজর রাখছে। সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই মজুত এখন তেহরানের কোনো কাজে আসবে না। একইসঙ্গে ঝুঁকির কারণে এখনই ইউরেনিয়াম উদ্ধারে বিশেষ বাহিনী পাঠাতেও রাজি নন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মজুতের বড় অংশ কোথায়
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসি গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরানের অধিকাংশ উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্ভবত ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সেই রয়েছে। স্থাপনাটি গত বছর বিমান হামলার শিকার হলেও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধ শুরুর আগে ইসফাহানে নিউক্লিয়ার টেকনোলজি সেন্টারের একটি টানেলে ১৮টি নীল কনটেইনারবাহী ট্রাক ঢুকেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কনটেইনারে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল এবং সেগুলো এখনো সেখানেই রয়েছে।
অজানা পরিমাণ ইউরেনিয়াম নাতাঞ্জ স্থাপনাতেও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন রাফায়েল গ্রসি।
মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দারা মনে করেন, ইসফাহান শহরের কাছে জাগ্রোস পর্বতমালায় একটি স্থাপনায় রাখা হয়েছে ইউরেনিয়ামের মজুত। গত বছরের হামলার পর স্থাপনাটিকে আরও সুরক্ষিত করে ইরান।
তবে এমন জল্পনাও রয়েছে, সিআইএ ও মোসাদের এজেন্টদের বিভ্রান্ত করতেই ওই স্থাপনার প্রবেশপথগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা পরিবর্তন করা হয়েছে।
আইএইএয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে ১০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ইউরেনিয়ামের অবস্থান জানতেও পারে, তারপরও সেগুলো উদ্ধার করতে বড় ধরনের রাসায়নিক, লজিস্টিক ও সামরিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কত কাছে ইরান
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এই যুদ্ধ শুরুর অন্যতম লক্ষ্য। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করে নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অ্যালব্রাইট বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই উপাদানগুলো জব্দ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরান দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে যেতে পারে।’
সংবাদমাধ্যম এবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘খুব ছোট একটি গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রেও অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র তৈরির মানে ইউরেনিয়াম রূপান্তর সম্ভব।’
বছরের পর বছর ধরে ইরানের প্রস্তুতি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে ‘ব্যাংকে প্রচুর টাকা জমা রাখার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন অ্যালব্রাইট।
বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, তেহরান হয়তো ইসফাহানের পাহাড়ি টানেলে কোনো গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে পারমাণবিক বোমার জ্বালানি তৈরির কাজ চালাচ্ছে।
ইউরেনিয়াম না পেলে কি আবারও যুদ্ধ হবে
পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড অ্যালব্রাইট বলেন, ‘আমার আশঙ্কা হলো, যদি এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান না হয়, তাহলে ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র জানতে পারে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে, তাহলে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।’
পরমাণু বিশেষজ্ঞ ও হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথু বানের মতে, ইউরেনিয়াম মজুতের সন্ধান পেলেই সেটা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত। ‘এই যুদ্ধ আগামী বছরগুলোতে ইরান সরকারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা অত্যন্ত কঠিন করে তুলতে পারে।’