এক্সপ্লেইনার

ইউএফও ফাইল প্রকাশ: স্বচ্ছতা নাকি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ‘ডাইভারশন’ কৌশল?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই হঠাৎ করে ‘ইউএফও ফাইল’ বা অজানা উড়ন্ত বস্তুর (ইউএফও/ইউএপি) গোপন নথি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।

এই প্রকাশনা ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—আসলেই কি এতে ভিনগ্রহী প্রাণের অস্তিত্বের কোনো ইঙ্গিত আছে, নাকি এটি রাজনৈতিকভাবে সময়ক্ষেপণের কৌশল?

সমালোচকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও মার্কিন প্রশাসনের বিতর্কিত নীতিগুলো থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পেন্টাগন দাবি করছে, এটি ‘স্বচ্ছতা’ বাড়ানোর উদ্যোগ।

ছবি: ওয়ার.গভ/ইউএফও

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, মার্কিন প্রশাসন এবার প্রায় ১৬০টির বেশি নথি, ভিডিও, ছবি, গোয়েন্দা রিপোর্ট ও সাক্ষ্য প্রকাশ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৪০-এর দশকের সামরিক রিপোর্ট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ড্রোন ও সামরিক বিমানের রহস্যময় ঘটনার বর্ণনা। নথিগুলো প্রকাশ করা হয়েছে নতুন ওয়েবসাইট ‘ওয়ার.গভ/ইউএফও’-তে, যাকে পেন্টাগন ‘প্রথম ধাপ’ বলে উল্লেখ করেছে। ভবিষ্যতে আরও নথি প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে।

প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি হলো অ্যাপোলো-১১ মিশনের নভোচারী বাজ অলড্রিনের একটি ডিব্রিফিং। সেখানে তিনি চাঁদের কাছে ‘উজ্জ্বল এক বস্তু’ দেখার কথা বলেছিলেন। আরেকটি নথিতে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের তোলা ছবিতে ত্রিভুজাকৃতিতে থাকা তিনটি আলোর বিন্দুর কথা উল্লেখ রয়েছে। পেন্টাগন নিজেও বলেছে, এসব আলোর উৎস সম্পর্কে ‘কোনো ঐকমত্য নেই’ এবং এগুলো ‘ভৌত বস্তু’ হতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের একটি সামরিক অভিযানের নথি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক বিমান পাহাড়ি এলাকায় একটি ‘অত্যন্ত উত্তপ্ত গোলক’ বা ‘সুপার হট অর্ব’–এর মুখোমুখি হয়। গোলকটি হঠাৎ দ্রুতগতিতে ছুটে যায়, পরে দুই ভাগে বিভক্ত হয় এবং আরও ছোট বস্তুর সৃষ্টি করে। সামরিক পাইলটরা এর গতি অনুসরণ করতে পারেননি।

ছবি: ওয়ার.গভ/ইউএফও

পেন্টাগনের নথিতে সিরিয়া, পূর্ব চীন সাগর, তাজিকিস্তান এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আকাশে রহস্যময় বস্তুর উপস্থিতির কথাও এসেছে। কোথাও ফুটবল-আকৃতির বস্তু, কোথাও কমলা রঙের স্থির আলো, কোথাও আবার আকাশে ‘অর্বস লঞ্চিং অর্বস’ ধরনের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তবে এসবের কোনোটির ক্ষেত্রেই ভিনগ্রহের প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়নি।

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বেলা হয়েছে, এই প্রকাশনার পেছনে বড় রাজনৈতিক ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতে তিনি সরকারি সংস্থাগুলোকে ইউএফও/ইউএপি–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের নির্দেশ দেন। ট্রাম্প দাবি করেন, আগের প্রশাসনগুলো জনগণের কাছ থেকে তথ্য গোপন করেছে, কিন্তু তার প্রশাসন ‘সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করতে চায়। এমনকি ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন—‘হ্যাভ ফান অ্যান্ড এনজয়!’ অর্থাৎ জনগণ যেন নিজেরাই এসব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন এই প্রকাশনা কেবল রাজনৈতিক ‘ডাইভারশন’ বা জনমত ঘোরানোর কৌশল। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ভূমিকা এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনার সময়েই ইউএফও নথি প্রকাশকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। আল জাজিরা জানিয়েছে, সমালোচকেরা বলছেন, যুদ্ধ ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতেই এমন ‘চমকপ্রদ’ নথি প্রকাশ করা হয়েছে।

ছবি: ওয়ার.গভ/ইউএফও

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন—কেন এখন? কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা, ড্রোন হামলা এবং ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিক্ষোভও হয়েছে। এই অবস্থায় ইউএফও ফাইল প্রকাশ জনগণের আগ্রহকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু সমালোচক এটিকে ‘ইনফরমেশন স্পেক্টাকল’ বা বিনোদনভিত্তিক রাজনীতি হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

এদিকে সংশয়বাদীরাও বলছেন, প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই নতুন নয়। বহু ভিডিও বা ছবি আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিক স্টিভেন গ্রিনস্ট্রিট বলেছেন, অধিকাংশ ভিডিওই ‘ঝাপসা’ এবং এগুলো হয়তো বেলুন, পাখি বা ক্যামেরার ত্রুটি ছাড়া আর কিছু নয়। গবেষক মিক ওয়েস্টও বলেছেন, এসবের মধ্যে ‘বিশেষ আকর্ষণীয় কিছু নেই’।

২০২৪ সালে পেন্টাগনের অল-ডোমেইন অ্যানোমালি রেজ্যুলেশন অফিস (এএআরও) একটি রিপোর্টে জানিয়েছিল, ভিনগ্রহের প্রযুক্তি বা প্রাণীর অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। অধিকাংশ ইউএফও দেখার ঘটনা আবহাওয়া, ড্রোন, স্যাটেলাইট, বেলুন বা অপটিক্যাল বিভ্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। সেই অবস্থান এখনও বদলায়নি। এবারের নথি প্রকাশেও পেন্টাগন সতর্ক করে বলেছে, ফাইলগুলো ‘নিরাপত্তা যাচাই’ করা হলেও অধিকাংশের পূর্ণ বিশ্লেষণ এখনও শেষ হয়নি।

ছবি: ওয়ার.গভ/ইউএফও

অন্যদিকে কিছু বিজ্ঞানী ও গবেষক বলছেন, বিষয়টিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউএপি বা আনআইডেন্টিফায়েড এনোমেলাস ফেনোমেনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বেড়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাভি লোয়েবের গ্যালিলিও প্রজেক্টসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আকাশে অজ্ঞাত ঘটনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে। কয়েকটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ইউএপি নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান জরুরি, কারণ দীর্ঘদিন ধরে এটি কুসংস্কার বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আড়ালে ছিল।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট—এই নথি প্রকাশের মাধ্যমে পেন্টাগন জনগণের কৌতূহলকে কাজে লাগাতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে ইউএফও–সংক্রান্ত আগ্রহ বহু পুরোনো। হলিউড সিনেমা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, রোজওয়েল ঘটনা—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। সেই মনস্তাত্ত্বিক আগ্রহকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এ ছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন ‘সত্য লুকানো হয়েছে’, কেউ আবার বলছেন ‘সরকার জনগণকে বোকা বানাচ্ছে’। মার্কিন ডানপন্থী কিছু রাজনীতিক এমনকি ‘ভিনগ্রহের প্রাণী’ বা ‘অতিপ্রাকৃত সত্তা’ সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। কিন্তু মূলধারার বিজ্ঞানীরা এসব দাবির ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক।

ছবি: ওয়ার.গভ/ইউএফও

সব মিলিয়ে পেন্টাগনের এই ইউএফও ফাইল প্রকাশ একদিকে যেমন নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে। প্রকাশিত নথিগুলোতে রহস্যময় কিছু ঘটনার বর্ণনা থাকলেও এখন পর্যন্ত ভিনগ্রহের প্রাণ বা প্রযুক্তির কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্য অনুসন্ধানের উদ্যোগ, নাকি যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে জনমত নিয়ন্ত্রণের আরেকটি কৌশল?

বিশ্বজুড়ে এখন নজর থাকবে—পরবর্তী ধাপে পেন্টাগন কী প্রকাশ করে এবং তাতে সত্যিই নতুন কিছু পাওয়া যায় কি না। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত যে, ইউএফও রহস্য আবারও বৈশ্বিক রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং জনমানসে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।