আফ্রিকার ‘আতঙ্ক’ ইবোলা ভাইরাস কেন বারবার ফিরে আসে?
আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে ৮০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। উগান্ডায়ও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রায় ৫০ বছর ধরে আফ্রিকায় আতঙ্কের আরেক নাম ইবোলা ভাইরাস। এ পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এটি।
ইবোলার কিছু স্ট্রেইন বা প্রজাতির টিকা ও চিকিৎসা উদ্ভাবিত হলেও এটি এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী ভাইরাস হিসেবে বিবেচিত। কঙ্গো ও উগান্ডায় নতুন করে এর প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
⚠️ 🇨🇩 Ebola case confirmed in DR Congo city held by M23 armed group: authorities
A case of Ebola has been confirmed in the eastern DR Congo city of Goma, says the director of the Congolese National Institute of Biomedical Research. Jean-Jacques Muyembe says the woman who tested… pic.twitter.com/GexKYGLiFL— AFP News Agency (@AFP) May 17, 2026
কোথা থেকে এসেছে ইবোলা
ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, যা তখন জাইর নামে পরিচিত ছিল।
ভাইরাসটি ‘ফিলোভিরিডি’ পরিবারের সদস্য, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র জ্বর।
কঙ্গোর উত্তরাঞ্চলে ‘ইবোলা’ নদীর তীরে প্রথম এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় ওই নদীর নামেই ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়।
এ পর্যন্ত ইবোলার ছয়টি ধরন বা প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো—জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি।
২০১৪ সাল থেকে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে ‘জাইর’ প্রজাতিটি।
যেভাবে ছড়ায়
ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই বাদুড় নিজে ইবোলায় আক্রান্ত হয় না। কেবলমাত্র ভাইরাসটি বহন করে। এছাড়া বনমানুষ, হরিণ ও সজারু এই ভাইরাস বহন করে এবং মানুষের শরীরে ছড়িয়ে দিতে পারে।
আক্রান্ত মানুষের প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ইবোলা ছড়ায়।
একজন সুস্থ মানুষ কোনো সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরের রক্ত, বমি বা মলের সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হতে পারেন।
এমনকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠানের সময় মৃতদেহের সরাসরি সংস্পর্শ থেকেও ছড়াতে পারে ভাইরাসটি।
ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। ফলে এটি অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের তুলনায় কম সংক্রামক। কিন্তু আক্রান্তদের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার ছিল ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ।
বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভাইরাসটি সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শরীরে বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে নতুন করে প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে।
লক্ষণ
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
প্রথম দিকে সাধারণত জ্বর, ক্লান্তি, শরীর ব্যথা, মাথা ও গলা ব্যথা হয়।
পরবর্তী ধাপে বমি, ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণও হতে পারে।
এই রোগ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা প্রায়শই আর্থ্রাইটিস বা গেঁটে বাত, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, চোখের প্রদাহ এবং শ্রবণজনিত জটিলতায় ভুগে থাকেন।
টিকা ও চিকিৎসা
বর্তমানে ইবোলা ভাইরাসের কেবল ‘জাইর’ প্রজাতির জন্য অনুমোদিত টিকা রয়েছে। যা হলো—মার্কের ‘এরভেবো’ ও জনসন অ্যান্ড জনসনের ‘সাবডেনো’।
২০২২ সালের শেষ দিক থেকে ‘সুদান’ ধরনের ইবোলার জন্যও তিনটি সম্ভাব্য টিকার পরীক্ষা চলছে।
এছাড়া ‘জাইর’ প্রজাতির বিরুদ্ধে দুটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি চিকিৎসা ব্যবস্থাও রয়েছে, যা মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করে।
রোগীদের চিকিৎসায় সাধারণত শরীরে তরল সরবরাহ ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে যেকোনো পরিস্থিতিতেই লক্ষণ দেখা দেওয়া রোগীদের চিকিৎসায় মূলত রিহাইড্রেশন বা শরীরে তরলের ভারসাম্য রক্ষা ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব
ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে, দক্ষিণ গিনিতে।
যা পরবর্তীতে পুরো পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় প্রধানত লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন ও গিনিতে আক্রান্ত ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে ১১ হাজার ৩০০’-এর বেশি মানুষ মারা যায়।
২০১৬ সালের মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে এই মহামারির সমাপ্তি ঘোষণা করে।
ডিআর কঙ্গোতে বারবার ইবোলার প্রাদুর্ভাব
১৯৭৬ সালের পর থেকে ডিআর কঙ্গোতে ১৫ বারেরও বেশি ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রাদুর্ভাবে দেশটিতে ৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে। তখন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ আক্রান্তের মধ্যে মারা যান প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৫ সালের আগস্টে সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবে অন্তত ৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা থাকলেও, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব
গত শুক্রবার ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে ‘বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
আফ্রিকার রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (সিডিসি আফ্রিকা) তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৩৬টি সন্দেহজনক সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
এ অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের চলাচল বেশি হওয়ার পাশাপাশি স্বর্ণের খনি নিয়ে বিরোধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে এ পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এ প্রজাতির সংক্রামণে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।