যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডের নতুন নীতিতে কী আছে? সংকটে পড়বেন কারা
যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসে আর গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে না। আগ্রহীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখানকার মার্কিন কনস্যুলেটের মাধ্যমে নতুন করে আবেদন করতে হবে।
গত ২১ মে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা দপ্তর (ইউএসসিআইএস) থেকে প্রকাশিত এক স্মারকে জানানো হয়, এখন থেকে কেবল ‘ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে’ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে গ্রিন কার্ড দেওয়া হবে।
একইসঙ্গে অভিবাসন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত লাখ লাখ অভিবাসী, যারা মার্কিন নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করতে আগ্রহী।
এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
আজ রোববার নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উঠে আসে কেন এই নতুন নীতি কার্যকর করছে ট্রাম্প প্রশাসন এবং অভিবাসী পরিবার, কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর তা কী প্রভাব ফেলবে নতুন নীতি।
কেন নতুন গ্রিন কার্ড নীতি
বোস্টন কলেজ ল’ স্কুলের অধ্যাপক ড্যানিয়েল কানস্ট্রুম টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রিন কার্ড অনুমোদনের সংখ্যা কমানো।’
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত যত বেশি সম্ভব মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ কঠিন করে তুলতে চায়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন এমন একদল মানুষকে নিয়ে কথা বলছি, যাদের এই দেশে বৈধভাবে থাকার সবচেয়ে জোরালো ও মানবিক কারণ রয়েছে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ বাসিন্দাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।’
তার ভাষায়, ‘বর্তমান প্রশাসন যত বেশি সম্ভব মানুষের জন্য স্থায়ী বসবাসের সুযোগ কঠিন করে তুলতে চায়।’
এই অধ্যাপক মনে করেন, কর্মসংস্থান-ভিত্তিক গ্রিন কার্ডের সংখ্যা কমিয়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য বেশি চাকরির সুযোগ তৈরি করতে চাচ্ছে প্রশাসন।
ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কালারের দেওয়া বিবৃতিতেও কেন ট্রাম্প প্রশাসন নতুন গ্রিন কার্ড নীতি চালু করেছে তার কারণ অনেকটা স্পষ্ট।
USCIS is applying long-standing law and prior court decisions to require certain aliens with temporary visas who decide they want to permanently reside in the U.S. to return to their home countries to apply for permanent visas through the @StateDept.
We're returning to the… pic.twitter.com/E2AFZkds5m— USCIS (@USCIS) May 22, 2026
ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই নীতিতে আইনি ফাঁক-ফোকর ব্যবহারের প্রবণতা কমে যাবে। ভিনদেশি নাগরিকরা যখন তাদের নিজ দেশ থেকে আবেদন করবেন, তখন গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে লুকিয়ে থাকার প্রবণতা এবং তাদের খুঁজে বের করে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন কমে আসবে।’
তবে সমালোচকরা বলছেন, এটি আসলে কোনো ‘ফাঁক-ফোকর’ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের ২৪৫ নম্বর ধারাতেই স্ট্যাটাস পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে এইচ-১বি’র মতো কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসাগুলো ‘ডুয়াল ইনটেন্ট’ নীতির আওতায় তৈরি করা হয়েছিল, যেন কেউ চাকরির ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে পারেন।
মার্কিন লিবারটারিয়ান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ক্যাটো ইনস্টিটিউট’ এর অভিবাসন বিষয়ক পরিচালক ডেভিড বিয়ার নতুন এ সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের ‘অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইউএসসিআইএসের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত এক বছরেই ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি গ্রিন কার্ডের অনুমোদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতদিন তারা গোপনে এ কাজ করছিল। এখন নতুন নীতির মাধ্যমে ১২ লাখ গ্রিন কার্ড আবেদনকারীকে একরকম ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।’
যেসব প্রভাব পড়বে
প্রতিবছর মার্কিন গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন জমা পরে প্রায় ৫ লাখের বেশি। সাময়িক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গ্রিন কার্ড পেতে আগ্রহীরা নতুন নীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য দুটি উপায়ে আবেদন করা যায়। প্রথমত, নিজ দেশের মার্কিন কনস্যুলেটের মাধ্যমে 'ইমিগ্র্যান্ট ভিসা'র আবেদন করা। দ্বিতীয়ত, সাময়িক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবস্থায় স্ট্যাটাস পরিবর্তনের জন্য আবেদন করা।
কিন্তু নতুন নীতি হওয়ার পর কারা যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আবেদন করতে পারবেন, আর কারা পারবেন না—তা কোন মানদণ্ডে ঠিক করা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এটা স্পষ্ট যে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি, পরিবার ও সুপ্রতিষ্ঠিত জীবন থাকা সত্ত্বেও গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে গিয়ে নিজ দেশে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে আবেদনকারীদের।
ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কারা
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন নীতিমালার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত গ্রিন কার্ডের আবেদনে আগ্রহীদের অর্ধেকের বেশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গ্রিন কার্ড পাওয়া ৭ লাখ ৮৩ হাজার জনের মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছিলেন মার্কিন নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মা।
২৮ শতাংশ ছিলেন শরণার্থী বা আশ্রয়প্রাপ্ত আর ১৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে গ্রিন কার্ড পেয়েছেন।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যারন রাইখলিন-মেলনিক সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘অর্ধেক গ্রিন কার্ড দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এমন মানুষদের, যারা স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন করেন।’
তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান থেকে শুরু করে দক্ষ পেশাজীবী—সবাই আছেন।’
রাইখলিন-মেলনিকের মতে, নতুন নীতির ফলে অনেককে চাকরি, পরিবার ও ঘরবাড়ি ছেড়ে নিজ দেশে গিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে এবং সেটা নিজ খরচেই। এতে আগে থেকেই জটিল হয়ে থাকা গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যাবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আবেদনকারীদের সম্পূর্ণভাবে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হবে, যাদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
অধ্যাপক ড্যানিয়েল কানস্ট্রুমের মতে, বিদেশে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ না থাকায়, বেশিরভাগ আবেদনকারীর আইনজীবী হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই আবেদন করার পরামর্শ দেবেন। কারণ একবার দেশ ছাড়লে আবেদন মঞ্জুর হলেও গ্রিন কার্ড পেতে মাসের পর মাস বা বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আবেদনের ক্ষেত্রেও এমন সমস্যা হতে পারে।
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন যারা
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা বা এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের উদ্যোক্তারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নতুন নীতি তাদের কর্মীদের জীবন অনিশ্চয়তায় ফেলবে এবং নতুন দক্ষ কর্মী নিয়োগও কঠিন হয়ে পড়বে।
অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম কোর্সেরার সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু এন এক্সে লিখেছেন, ‘এতে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, চিকিৎসক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানীর সংখ্যা কমবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেমেন্স বলেন, ‘ভারতীয় দক্ষকর্মীদের জন্য এটি বড় ক্ষতির কারণ হবে।’
তার ভাষায়, ‘ইবি-২ বা ইবি-৩ ভিসার আবেদনকারী ভারতীয় কর্মীদের নিজ দেশে বসে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই অনেকে হাল ছেড়ে দেবেন। আর যুক্তরাষ্ট্র ওই দক্ষ কর্মীদের হারাবে।’
তীব্র সমালোচনার মুখে ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র কাহলার নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের আগের প্রক্রিয়াতেই আবেদন করার জন্য বলা হয়েছে।
চাপে পড়বে পারিবারিক ভিসা
মার্কিন নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্ট্যাটাস পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পাওয়া সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি।
বিশেষ করে কে-১ ভিসাধারী কেউ মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করার উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে, তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
অভিবাসন আইনি সহায়তা দেওয়া খ্রিস্টান মানবিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিলিফ বলছে, নতুন নীতিটি ‘পরিবারবিরোধী’।
সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট মায়াল গ্রিন বলেন, ‘এটি স্বামীকে স্ত্রী থেকে, সন্তানকে বাবা-মা থেকে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর আলাদা করে দেবে।’
তিনি বলেন, ‘এই নিষ্ঠুর ও পরিবারবিরোধী নীতির পক্ষে কোনো শক্তিশালী যুক্তি নেই। আমি আশা করি এটি প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা, কংগ্রেস বা আদালতের মাধ্যমে বাতিল হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বর্তমানে ৩৯টি দেশের নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছেন।
রাইখলিন-মেলনিক বলেন, ‘একবার তারা দেশ ছাড়লে হয়তো কয়েক দশকের মধ্যেও ফেরার সুযোগ পাবেন না।’
ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরাও
ইউএসসিআইএসের ঘোষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসে এবং পড়াশোনা শেষেই তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।
তবে ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ডেভিড বিয়ারের মতে, এই নীতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসে, পরে চাকরি পায়। কেউ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসে, পরে বিয়ের প্রস্তাব পায়। আবার কেউ এমন দেশ থেকে আসে, যেখানে হয়তো পরে নিপীড়ন শুরু হয়।’
অধ্যাপক কানস্ট্রুম বলেন, যারা ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা—নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে তাদের ওপর।
কারণ একবার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লে অনেক ক্ষেত্রে এই শিক্ষার্থীরা আরও কয়েকবছরের মধ্যে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ নাও পেতে পারেন।
