যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরায়েল
লেবানন ও ইসরায়েলের সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গতকাল বৃহস্পতিবার গোষ্ঠীটি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও দেশটি থেকে সেনা সরাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা তেহরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগকে সংকটে ফেলেছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে পূর্বশর্ত হিসেবে রেখেছে ইরান। এমনকি তেহরান এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছে যে, ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকলে তারা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সম্মত হয়। এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এই যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল, লেবানন বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সাফ জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী ওই এলাকা থেকে পিছু হটবে না কিংবা অভিযানও বন্ধ করবে না। গত মার্চে ইরানের সাথে যুদ্ধের সমান্তরালে লেবাননে এই সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।
এদিকে, ১৯৮২ সালে হিজবুল্লাহ গঠন করা ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনীকে অবশ্যই যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে।
হামলা অব্যাহত
মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও চলতি সপ্তাহে লেবানন, গাজা, উত্তর ইসরায়েল এমনকি কুয়েতেও হামলা হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার মন্তব্য করেন— চুক্তির মানে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হওয়া নয়, বরং ‘আরেকটু নিয়ন্ত্রিতভাবে গোলাগুলি চালানো’।
একই দিনে পারস্য উপসাগরে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর এটিই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত।
কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানি বাহিনীর হামলায় একজন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে বিমান হামলা চালিয়েছে।
সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়, তবে তিন মাস আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি মূলত বন্ধ রয়েছে।
শিপিং ডেটা অনুযায়ী, ইরানের তেল রপ্তানি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে লেবাননের যুদ্ধবিরতি ওয়াশিংটন ও তেহরানকে কূটনৈতিক সমাধানের পথ দেখাবে—এমন আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।
যদিও গত মার্চের শেষ দিক থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, চুক্তি সন্নিকটে, তবে বাস্তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর জন্য নিজ দেশে চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। গত বুধবার তিনি এক বিরল রাজনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হন। মার্কিন প্রতিনিধি সভা (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে এই ভোট মূলত প্রতীকী, কারণ ট্রাম্প এই বিলে সই করে একে আইনে পরিণত করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার বলেন, শত্রুরা ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়েছে এবং এখন তারা অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যুদ্ধের শুরুতে বিমান হামলায় বাবার মৃত্যুর পর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
তেহরান এখন মূলত আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলার তেলের রাজস্ব ফেরত, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চাইছে।