পদত্যাগ করছেন না ভারতের শিক্ষামন্ত্রী, আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ককরোচদের

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে টানা এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের একাধিক দফা বৈঠক হলেও শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণের দাবিতে কোনো ছাড় দিচ্ছে না কেন্দ্রীয় সরকার।

সরকারি সূত্রের দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করছেন না। অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের মূল দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

অপরদিকে দ্য হিন্দু বলছে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও শিক্ষার্থীরা নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগে দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসের বেশি সময় ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। আন্দোলনে পরে যোগ দেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। 

শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক হলেও প্রধান দাবি—ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে কোনো সমাধান হয়নি।

পদত্যাগ নয়, কিছু দাবিতে নীতিগত সম্মতি

বৈঠক শেষে আন্দোলনকারীরা জানান, তিনটি মূল দাবি ও শিক্ষা সংস্কারসংক্রান্ত পাঁচটি প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে নিট-সংক্রান্ত ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করেন সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। তবে শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণের দাবিতে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।

সরকার আন্দোলনকারীদের কাছে শনিবার বিকেল পর্যন্ত সময় চেয়েছিল। তবে একই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সূত্র জানিয়ে দেয়, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সম্ভাবনা নেই।

‘হ্যাঁ অথবা না’—সরকারের স্পষ্ট জবাব চান আন্দোলনকারীরা

শনিবার তৃতীয় দফার বৈঠকের আগে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, সরকার যদি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না করাতে চায়, তাহলে সেটি স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হবে।

তার ভাষায়, ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিষয় নিয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের মূল দাবি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই সরকারকে ‘হ্যাঁ অথবা না’—এমন পরিষ্কার উত্তর দিতে হবে। যদি ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করেন, তাহলে এ ধরনের বৈঠকের আর কোনো অর্থ নেই এবং আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। ছবি: এএফপি

রাহুল গান্ধীর সমর্থন

লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

নয়াদিল্লিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। তার ভাষায়, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, অযোগ্য ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ’ শিক্ষামন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকেই বরখাস্ত করতে হবে।

রাহুল আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

তার দাবি, শিক্ষার্থীরা কোনো শিক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ চায়।

ছবি: এএফপি

কঠোর নিরাপত্তায় দিল্লি

এই আন্দোলন ঘিরে রাজধানী দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ।

যন্তর মন্তরের আশপাশে অতিরিক্ত ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। অনেক জায়গায় ব্যারিকেডগুলো ভারী শিকল দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সহজে সরানো না যায়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়াতে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও মোবাইল নজরদারি ভ্যান মোতায়েন করা হয়েছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে টানা চতুর্থ দিনের মতো মধ্য দিল্লির ১৮টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কিছু ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন চালু রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত ১৩টি এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ।

অন্যদিকে সিজেপির অভিযোগ, পুলিশ আন্দোলনস্থলে সমর্থকদের প্রবেশ, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছানোয় বাধা দিচ্ছে। এমনকি আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার পাঠানো রেস্তোরাঁগুলোকেও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

আন্দোলনের সময় পেলেট গান ও বৈদ্যুতিক শক ব্যাটন ব্যবহারের অভিযোগ তুলে সেগুলো নিষিদ্ধ করারও দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন ও চিকিৎসকদের একটি জোট।

অমৃতসরে কংগ্রেস কর্মীদের বিক্ষোভ। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। ছবি: এএফপি

আন্দোলনের প্রভাব অন্যান্য রাজ্যেও

রাজধানী দিল্লির বাইরে বিভিন্ন রাজ্যেও আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে।

বিহারে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ‘বিহার বন্ধ’ পালিত হচ্ছে। এর আগে সেখানে সিপিআই (এমএল) ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে কলকাতায় শিক্ষার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত মিছিলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর ছয়টি মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে পাঁচটি মামলাই সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।

অসুস্থ হয়েও আন্দোলনে থাকার ঘোষণা

আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে অনশন ভাঙার পর সরকারের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ নাকচ করেছেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা থেকেই তিনি অনশন ভেঙেছেন, সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা হয়নি।

পাটনায় ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ছবি: এএফপি

৪৭ এনটিএ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

চলতি বছরের নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। সরকার ইতোমধ্যে প্রশ্নফাঁসবিরোধী আইন আরও কঠোর করা এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) ৪৭ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশাসনিক এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পরীক্ষা-ব্যবস্থার সংকটের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে। সেই দাবিতে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে টানাপোড়েন এখনো অব্যাহত রয়েছে।