শি-ট্রাম্প বৈঠকে যে ৫ ইস্যু বদলে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক
বুধবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে যখন বোয়িং ৭৪৭ ট্রাম্প-ওয়ান অবতরণ করবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন এক কূটনৈতিক সূচনা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই রানওয়েতে উপস্থিত থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তার সহধর্মিণী ম্যাডাম পেং লিউয়ানকে অভ্যর্থনা জানাবেন।
ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের দপ্তর থেকে হোয়াইট হাউসের দেওয়া এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে আয়োজন করা হবে এক রাজকীয় রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৭৯ জন সেনাসদস্য সুসজ্জিতভাবে সারিবদ্ধ হয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সামরিক সম্মান জানাবেন।
হোয়াইট হাউসের সুপরিচিত দক্ষিণ বারান্দায় মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ ট্রাম্পেটের সুরের পর মূল অডিটোরিয়াম ‘ইস্ট রুমে’ বেজে উঠবে দুই পরাশক্তির জাতীয় সংগীত।
আকাশে একটি বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান এবং চারটি এফ-২২ র্যাপটর যুদ্ধবিমান উড়ানোর মধ্য দিয়ে সামরিক কুচকাওয়াজ শেষ হবে।
রাজকীয় এই আয়োজনের পর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ম্যাডাম পেং লিউয়ান যৌথভাবে স্মিথসোশিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট পরিদর্শন করবেন।
বৃহস্পতিবার রাতে ইস্ট রুমে বর্ণাঢ্য রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং শুক্রবার রেড রুমে চা-চক্র ও ন্যাশনাল আর্কাইভে ঐতিহাসিক নথি পরিদর্শনের মাধ্যমে শেষ হবে এই মেগা সফর।
কিন্তু এই অভূতপূর্ব সামরিক প্রদর্শনী, লালগালিচা ও রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের ঠিক পেছনেই জমাট বেঁধে রয়েছে এক মারাত্মক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১১ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসছেন শি জিনপিং।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক ডেভিড পিয়ারসন লিখেছেন, ওয়াশিংটনে বাইরে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে দুই দেশের টানাপোড়েন রয়েই গেছে। বিশেষ করে পাল্টাপাল্টি শুল্ক, রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজে চীনের নিয়ন্ত্রণ, এআই নিয়ে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এবং অদৃশ্য সাইবার হামলাসহ অনেক পুরোনো বিরোধের কোনো সুরাহা এখনো হয়নি।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যের জটিল হিসাব-নিকাশ।
প্রটোকলের চমক ও শি
হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শি জিনপিংয়ের এই ওয়াশিংটন সফর দুই পরাশক্তির সম্পর্কের ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সফরের প্রস্তুতি পর্বে ওয়াশিংটনের অগোছালো পরিকল্পনায় চীনা কর্মকর্তারা কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলেন।
তবুও বেইজিং এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে তাদের শীর্ষ কূটনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ক্লেয়ারমন্ট ম্যাককেনি কলেজের চাইনিজ লিডারশিপ পলিটিকস বিষয়ের অধ্যাপক মিনক্সিন পেই বলেন, শি জিনপিং নিজ দেশের জনগণের সামনে নিজেকে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বিশ্বনেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। হোয়াইট হাউসে রাজকীয় ভোজে আপ্যায়িত হওয়ার চেয়ে বড় বৈশ্বিক সম্মান আর কিছু হতে পারে না।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় মার্কিন বহরে অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং টেসলার ইলন মাস্ক উপস্থিত ছিলেন। এবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনে আসছেন চীনের শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল।
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি, প্রযুক্তি জায়ান্ট শাওমি এবং ইনোলাইটের প্রধান নির্বাহীরা শি জিনপিংয়ের এই বহরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের দাবি, দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণাও আসতে পারে।
১০ নভেম্বর ও বুসান চুক্তি
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন সম্মেলনে দুই নেতার সবচেয়ে জরুরি আলোচ্য বিষয় হলো বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো।
গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে দুই নেতা যে অস্থায়ী বাণিজ্য বিরতি চুক্তি সই করেছিলেন, তার মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, বুসান চুক্তি নবায়ন না হলে দুই দেশ আবারও একে অপরের পণ্যে আকাশচুম্বী শুল্ক আরোপ করবে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাও ফিরিয়ে আনবে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবার নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে, যা গত বছরের ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদায় গত মাসে চীনের রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আমদানির চেয়ে ১১৯ বিলিয়ন ডলার বেশি আয় করেছে দেশটি।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সংঘাত এড়াতে দুই পক্ষ ‘৩০ বাই ৩০’ সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। এই ব্যবস্থার অধীনে উভয় দেশই একে অপরের ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর থেকে বিদ্যমান শুল্ক প্রত্যাহার করে নেবে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং বিবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের বৈঠকে গঠিত ‘বোর্ড অব ট্রেড’ কাঠামোর অধীনে প্রায় ১০টি অসংবেদনশীল পণ্য শ্রেণি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিনিয়োগসংক্রান্ত ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ আলোচনা অনেকটাই থমকে গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন প্রতি বছর ২৫ মিলিয়ন টন আমেরিকান সয়াবিন এবং অতিরিক্ত ১৭ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্যসহ বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ কতদিন হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সামনের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ মাথায় রেখে ছয় মাস থেকে এক বছরের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বেইজিং ট্রাম্পের পুরো মেয়াদজুড়ে স্থায়ী শুল্ক স্থগিতাদেশ দাবি করছে।
রেয়ার আর্থ ও জাপান সংকট
বিরল মৃত্তিকা ধাতু বা রেয়ার আর্থ নিয়ে চীনের কড়া নিয়ন্ত্রণের চিত্র উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
বিশ্বজুড়ে উন্নত প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ির ইঞ্জিন, উইন্ড টারবাইন, লেজার ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহৃত রেয়ার আর্থের ৯০ শতাংশই পরিশোধিত হয় চীনে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাত ধরনের রেয়ার আর্থ ও চুম্বক রপ্তানিতে বিশেষ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করে।
এরপর আগামী ১০ নভেম্বর থেকে আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। এর মধ্যে রয়েছে এরবিয়াম, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার এবং সাবমেরিনের অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বেইজিং পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমেরিকান ক্রেতাদের পর্যাপ্ত লাইসেন্স দিচ্ছে না এবং বন্দরে চালান আটকে রাখছে।
থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষণে বলা হয়, আমেরিকান সামরিক বাহিনীর মোট রেয়ার আর্থের চাহিদা বৈশ্বিক চাহিদার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ রেয়ার আর্থের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত।
মার্কিন প্রশাসন নিজের দেশে খনিজ উত্তোলন বাড়াতে যে সময় চাচ্ছে, চীন সেই সময়টুকু ওয়াশিংটনকে দিতে নারাজ।
এর পাশাপাশি জাপানের ওপর চীনের খনিজ অবরোধ আঞ্চলিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ঘোষণা করেছিলেন যে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে জাপান সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এর জবাবে জাপানে রেয়ার আর্থ 'চুম্বক' রপ্তানি ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয় এবং বিশেষ খনিজ 'ডিসপ্রোসিয়াম' সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দেয়।
এছাড়া চীনা পর্যটকের আগমন ৫৯ শতাংশ কমে যায়। জাপানি সামুদ্রিক খাবার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয় চীনে।
ওয়াশিংটন সম্মেলনের ঠিক দুই দিন আগে নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করে সাহায্য চেয়েছেন তাকাইচি।
কিন্তু বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন ও অন্যান্য কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে তার তাইওয়ানবিষয়ক বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
এআই ও সাইবার সংঘাত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার স্পেস এখন দুই পরাশক্তির নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মূল রণক্ষেত্র।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিউইয়র্কে চীনে তার সমকক্ষ হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিবিসি জানায়, দুই দেশ একটি যৌথ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংলাপ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনার জন্য তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা গঠনে সম্মত হয়েছে।
তবে আটলান্টিক কাউন্সিল ও কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষণায় এই বিষয়ে গভীর বৈরিতার চিত্র উঠে এসেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, সিআইএসএ ও এনএসএ যৌথ সতর্কবার্তায় অভিযোগ করেছে, চীনের ছয়টি শীর্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান মূল ফ্রন্টিয়ার মডেল, যেমন অ্যানথ্রোপিকের ক্লড মিথোস এবং ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৫ থেকে বেআইনিভাবে ডেটা চুরি করে নিজেদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, চীনা মডেলগুলোতে আমেরিকান মডেলের জলছাপ পাওয়া গেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার ভেতরেও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই নিরাপদ প্রযুক্তির জন্য গতি কমানোর আহ্বান জানালেও এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিবিসি জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এআই ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যে জিতবে, সে পুরো বিশ্বে রাজত্ব করবে।
অন্যদিকে, আটলান্টিক কাউন্সিল জানায়, চীনের নিরাপত্তামন্ত্রী চেন ইয়িক্সিন এক নিবন্ধে লিখেছেন, জেনারেটিভ এআই, ডিপফেক ও ট্রল ব্যবহার করে শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
এর পাশাপাশি সাইবার সংঘাতও চরম আকার ধারণ করেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাইবার বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম সেগালের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ও এফবিআই একাধিক চীনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জব্দ করেছে, যা রাষ্ট্রীয় হ্যাকাররা ব্যবহার করে। এই হ্যাকাররা ফেডারেল রিজার্ভ ও মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও নিশানা করেছিল।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাওয়ার গ্রিড, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে চীনের সাইবার হামলা মার্কিন নিরাপত্তার জন্য অভূতপূর্ব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাইওয়ান ও ইরান সমীকরণ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক ও সামাজিক কৌশলের চিত্র উঠে এসেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকে এক বিরল সুযোগ হিসেবে দেখছে বেইজিং।
তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অস্ত্র বিক্রয় প্যাকেজ অনুমোদন না করে আটকে রেখেছেন ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, মার্কিন অস্ত্র হলো চীনের সঙ্গে দরকষাকষির একটি চমৎকার হাতিয়ার।
আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৯৮২ সালের রেগান প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি এখন পুরোনো ইতিহাস। সাড়ে নয় হাজার মাইল দূরে আমেরিকার কোনো যুদ্ধে যুক্ত হওয়া উচিত নয়।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক জরিপে দেখা গেছে, তাইওয়ানের মাত্র ২৪ শতাংশ ভোটার মার্কিন প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও জানায়, তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কেএমটির চেয়ারউম্যান চেং লি-উয়ানকে বেইজিংয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের সঙ্গে গোপন বৈঠকের পর চেং প্রকাশ্যে ‘এক চীন’ নীতি মেনে নেন এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন।
এর পাশাপাশি তাইওয়ানে প্রায় ৪৫ হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালাচ্ছে বেইজিং।
এমনকি তাইওয়ানের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল কেএমটি চাপ সৃষ্টি করে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সরকারের ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট ছাঁটাই করতে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট দুই পরাশক্তির বাণিজ্যিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ইরাকে হামলার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের প্রধান পাইপলাইন বন্ধ করে দিলে চীনে তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়।
এরপর বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র লোহিত সাগরে শিপিং সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইরানের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনাও করছে তারা। তাই চীনা কোম্পানিগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তবে চীনা সামরিক কর্মকর্তা ঝো বো ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ট্রাম্প অনুরোধ করলে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত চীন।
দুই পরাশক্তি ও সময়ের খেলা
নিউইয়র্ক টাইমসের ডেভিড পিয়ারসন তার বিশ্লেষণে লিখেছেন, ওয়াশিংটন শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্প ও শি জিনপিং সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়কালের ভাবনা নিয়ে আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন।
অতি নিকটবর্তী মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ যুদ্ধের হিসাব দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সময় নির্ধারিত হচ্ছে। তাই নির্বাচনের মুখে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের চাপ ফেলা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।
অপরদিকে, ৭৩ বছর বয়সী শি জিনপিং আগামী বছর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে চতুর্থ মেয়াদে আরও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা সুসংহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি নিজের শর্তে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাল চালিয়ে যেতে পারেন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের গবেষক জোনাথন জিন ও ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুয়াইশেং ঝাও নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, শি জিনপিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এই সময়কাল অতিক্রম করা।
বেইজিংয়ের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি, আবাসন সংকট ও তরুণদের বেকারত্ব দূর করতে এই সময়টুকু শি জিনপিংয়ের ভীষণ প্রয়োজন।
এছাড়া সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদে পুনর্গঠন সম্পন্ন করা এবং আমেরিকার সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে নিজেদের শিল্প ও প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়িয়ে নেওয়াও বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য।
সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক স্কট কেনেডি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল চরম একতরফা চাপ দিয়ে চীনকে নতিস্বীকার করাবে। কিন্তু ঘটেছে তার ঠিক উল্টোটা। রেয়ার আর্থ খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে বেইজিং ট্রাম্প প্রশাসনকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। আজ চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করে।
বেইজিং বারবার গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার যে বার্তা প্রচার করছে, মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, তা মূলত ওয়াশিংটনের হাত-পা বেঁধে রাখার একটি কূটনৈতিক কৌশল।
অতএব, একের পর এক এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন শি জিনপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ। দুই পরাশক্তির এই বৈঠকে শি জিনপিং সময়ের খেলায় সাময়িক স্বস্তি কিনে নিলেও পর্দার আড়ালের এই কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।





