গ্রীষ্মে কেন অপরিচিতদের বাড়ির পেছনের বাগানে আমন্ত্রণ জানান এস্তোনিয়ানরা
প্রতি গ্রীষ্মে এস্তোনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ির বাগান, গ্যারেজ, এমনকি শোবার ঘরের জানালাও অস্থায়ী ক্যাফেতে পরিণত হয়। আর সেখানে ঢুঁ মারতে পারেন যে কেউ।
বিশাল এক তাঁবুর নিচে দুপুরের খাবার কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন একেবারে অপরিচিত মানুষ। চারপাশে শসা, স্ট্রবেরি, রসুন ও কোরজেটের সবজি বাগান। একটি আপেলগাছের ছায়ায় সাজানো টেবিলে রাখা রাই রুটি, ঘরে তৈরি আচার আর ধোঁয়া ওঠা সেলিয়াঙ্কা স্যুপ—যাতে রয়েছে হ্যাম ও ধোঁয়ায় শুকানো সসেজ। অতিথিরা ছাপানো মেনু থেকে খাবার বেছে নিয়ে সবার সঙ্গে একই টেবিলে বসে খেতে শুরু করেন।
প্রথম দেখায় এটি গ্রামের কোনো ক্যাফে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে এটি এস্তোনিয়ার ছোট শহর কেহরার উপকণ্ঠে হেইকি কালভিক নামে এক ব্যক্তির বাড়ির পেছনের বাগান।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিন থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের পথের এই শহরে প্রতি গ্রীষ্মে অনেকেই নিজের বাগানকে অস্থায়ী ক্যাফেতে রূপ দেন।
কালভিক বিবিসিকে বলেন, ‘আমি খুবই মিশুক মানুষ। রান্না করতে ভালোবাসি, অতিথি আপ্যায়ন করতে ভালো লাগে। আর এই বাইরের জায়গাটা নিয়ে আমি গর্বিত।’
কথা বলতে বলতেই আরেক দল অতিথি এসে হাজির হয়।
কালভিক কেহরার প্রায় এক ডজন বাসিন্দার একজন, যারা প্রতিবছর 'কোদুকোহভিকুতে প্যেভ' বা ‘হোম ক্যাফে ডে’তে অংশ নেন। জুলাইয়ের একটি দিনে তারা নিজেদের বাগান, উঠান বা গ্যারেজকে এক দিনের জন্য ক্যাফেতে পরিণত করেন।
শহরের অন্য প্রান্তে কারোলিন ভাহত্রে নামে এক ব্যক্তি সোভিয়েত আমলের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পেছনের গ্যারেজে অস্থায়ী ক্যাফে খুলেছেন। সেখানে বিক্রি হচ্ছে টেম্পুরা সুশি রোল, চ্যান্টেরেল মাশরুমের কিশ, চকোলেট কেক ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।
বিবিসি জানায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এস্তোনিয়াজুড়ে এ ধরনের ১৫০টিরও বেশি আয়োজন হয়। প্রায় দুই দশক আগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন সারা দেশের জনপ্রিয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
কোথাও ভাড়া করা তাঁবু, টেবিল-চেয়ার নিয়ে বড় আয়োজন হয়, আবার কোথাও শিশুদের পরিচালিত ছোট্ট একটি লেমোনেডের স্টলই পুরো ক্যাফে।
তবে সব আয়োজনের একটি মিল আছে। দর্শনার্থীরা এদিন এস্তোনিয়ানদের দৈনন্দিন জীবনের এমন এক ঝলক দেখার সুযোগ পান, যা সাধারণত বাইরের মানুষের নাগালের বাইরে থাকে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল ‘হোম ক্যাফে’ ঐতিহ্য
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে এস্তোনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ হিইউমায় এই ঐতিহ্যের সূচনা।
সেই সময় স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তারা জুলাইয়ের ব্যস্ত মৌসুমের বাইরে কীভাবে পর্যটক টানা যায়, সে উপায় খুঁজছিলেন। অনুপ্রেরণা আসে দ্বীপের রাজধানী কার্দলার দীর্ঘ কফি-সংস্কৃতি থেকে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সেখানে এক বাল্টিক-জার্মান ব্যারনের পরিচালিত উলের কাপড়ের কারখানা ছিল। মধ্য ইউরোপ থেকে আসা শ্রমিকেরা নিয়মিত কফি পান করতেন। ধীরে ধীরে স্থানীয় এস্তোনিয়ানরাও সেই অভ্যাস গড়ে তোলেন।
পরে কার্দলার বাসিন্দারা কোহভিলেহক্রিদ বা ‘কফির ফ্লাস্ক’ নামে পরিচিতি পান। কারণ, অন্যরা যেখানে মাঠে কাজ করতে টক দুধ বা বিয়ার নিয়ে যেতেন, তারা সঙ্গে নিতেন কফি। ২০০৭ সালের প্রথম ‘ক্যাফে ডে’-তে অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৫টি বাড়ি।
আজ আগস্টের শুরুতে তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে হাজারো মানুষ যোগ দেন। পুরো দ্বীপজুড়ে কয়েক ডজন অস্থায়ী ক্যাফেতে বিক্রি হয় ঘরে তৈরি নানা খাবার ও পানীয়।
হিইউমা জাদুঘরও শুরু থেকেই এই আয়োজনের অংশ। জাদুঘরের প্রধান ভবন ‘লং হাউসে’ উনিশ শতকের একটি ক্যাফের পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করা হয়। ভবনটি একসময় সেই কাপড় কারখানার ব্যবস্থাপকদের বাসভবন ছিল।
জাদুঘরের পরিচালক কৌরি কিভরামিস বিবিসিকে বলেন, এই ঐতিহ্য শুধু খাবারকে ঘিরে নয়, দ্বীপবাসীর অতিথিপরায়ণতার দীর্ঘ ইতিহাসেরও অংশ।
তার ভাষায়, ‘এমনকি তথাকথিত "অন্তর্মুখীদের দ্বীপের" মানুষও সব সময় বুঝেছে, একসঙ্গে থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আগে জাহাজডুবির কারণে অনেক বিদেশি এখানে এসে পড়তেন। তাদের সাহায্য করা এখানকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।’
দ্বীপের ঐতিহ্য থেকে জাতীয় আয়োজনে
এস্তোনিয়ার মূল ভূখণ্ড ও দ্বীপাঞ্চলের ছোট ছোট গ্রামীণ সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সামাজিক জীবনের ভিত্তি।
আগের মতো মানুষ এখন প্রতিবেশীদের ওপর ততটা নির্ভরশীল না হলেও কিছু ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে একটি তালগুদ—যেখানে একসময় সবাই মিলে ঘাস কাটতেন বা গোয়ালঘর বানাতেন। এখন মূলত কমিউনিটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেই এ আয়োজন হয়।
হোম ক্যাফে ডেও সেই একই প্রতিবেশীসুলভ চেতনাকে ধারণ করে। হিইউমায় সফল হওয়ার পর এটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার সেতোমা অঞ্চলে প্রতিবছর আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে 'পপ-আপ ক্যাফে ডে' হয়। এ উপলক্ষে অঞ্চলটি তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি তুলে ধরে।
আয়োজক সংগঠন সেতো কিউকের বোর্ড সদস্য লিস কোগেরমান বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে এমন অনুষ্ঠান খুব কমই ছিল, যেখানে মানুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বা আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার (যেমন ঘরে তৈরি পনির সইর) পরিবেশন করতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই এই উৎসবের শুরু।’
সময়ের সঙ্গে এটি অঞ্চলটির অন্যতম পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। কিছু ক্যাফেতে এক হাজার পর্যন্ত দর্শনার্থীও আসেন।
তবে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারীর ব্যবসা করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তারা শুধু নিজেদের রান্না অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার আনন্দ উপভোগ করেন।
জানালা দিয়ে আইসক্রিম বিক্রি
একই চিত্র দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়নগরী তারতুতেও।
ইঙ্গা কুলমোজা এক দিনের জন্য একটি পপ-আপ ক্যাফে চালান, যেখানে তিনি নিজের হাতে তৈরি আইসক্রিম বিক্রি করেন।
তিনি একটি পুরোনো কাঠের বাড়িতে থাকেন, যার কোনো উঠান নেই। তাই প্রতি বছর শোবার ঘরের তৃতীয় তলার জানালা থেকে দড়িতে ঝুলিয়ে আইসক্রিম নামিয়ে দেন রাস্তার ক্রেতাদের কাছে।
হেসে তিনি বলেন, ‘এটি খুবই স্বল্প প্রযুক্তিনির্ভর।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) উদ্যোক্তা হিসেবে তার পেশাগত জীবনের সঙ্গে এই ক্যাফের কোনো মিল নেই।
তিনি বলেন, ‘শুধু নগদ টাকা নেওয়া হয়। সাইনবোর্ডগুলো পুনর্ব্যবহৃত কাগজে লেখা। আমরা শুধু কয়েকটি দড়ি কিনেছি। দুটি বালতি আছে—একটিতে আইসক্রিম, আরেকটিতে টাকা। এমনকি আইসক্রিম তৈরির কোনো মেশিনও ব্যবহার করি না। ফ্রিজারেই সব বানাই।’
সারাদিন আইসক্রিম আর টাকার বালতি ওঠানামা করাতেই ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। তবু প্রতি বছর একই মানুষদের আবার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভালো লাগে।
কুলমোজার ভাষায়, ‘মানুষ অন্যদের দেখাতে চায়, তারা কী করতে পারে, কীভাবে জীবনযাপন করে।’
তিনি জানান, এস্তোনীয় ভাষায় এর জন্য একটি বিশেষ শব্দ আছে—এদেভুস। যার অর্থ, ‘অন্যদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার অনুভূতি।’
যখন অপরিচিত মানুষ হয়ে ওঠেন প্রতিবেশী
ওলেগ পুন ও ইরিনা তোপিলিনা ২০১৯ সালে ইউক্রেন থেকে এস্তোনিয়ায় যান।
তবে প্রথমবারের মতো হোম ক্যাফে চালু করেন ২০২২ সালে। ওই বছর যুদ্ধের কারণে পুনের বাবা-মাও এস্তোনিয়ায় আশ্রয় নেন।
নতুন গ্রামে দ্রুত পরিচিত হতে তারা বাবা-মাকে হোম ক্যাফে ডেতে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তোপিলিনা স্মরণ করেন, ‘এত মানুষ যে তাদের সমর্থন জানাতে এসেছিল, তা দেখে তারা খুবই আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। এমনকি বসার জায়গা কম দেখে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীরাও নিজেদের চেয়ার-টেবিল এনে দিয়েছিলেন।’
এখন পুরো পরিবার মিলে কালামায়া ডেজ উৎসবে নিজেদের বাগানে ক্যাফে চালান।
এ বছর তারা প্রায় ১০০ বছর পুরোনো পারিবারিক রেসিপিতে তৈরি বাঁধাকপির ভারেনিকি এবং স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সরেল ও নেটল পাতা দিয়ে খোলা আগুনে রান্না করা সবুজ বোরশ্চ পরিবেশন করেছেন।
বাইরের মানুষের কাছে এস্তোনিয়ার হোম ক্যাফে ডে হয়তো গোপন কোনো উৎসবের মতো মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে এটি বছরের এমন কয়েকটি দিনের একটি, যখন দর্শনার্থীরা স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারেন, পারিবারিক রেসিপির খাবার চেখে দেখতে পারেন এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পান।
কালামায়া ডেজের আয়োজক ক্যাটরিন এদমা বলেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠানগুলো সাধারণত বন্ধই থাকে। খুব কম সময়ই বাইরের মানুষ সেগুলো দেখতে পারেন। কিন্তু এই একটি দিনেই মানুষ তাদের হৃদয়ের পাশাপাশি বাড়ির ফটকও সবার জন্য খুলে দেন।’