বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ২ বার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: জয়সওয়াল

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুই দফা ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

গতকাল নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি।

জয়সওয়াল বলেন, ‘ভারতের হাইকমিশনার গতকাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দুটি আমন্ত্রণের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।’

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে জয়সওয়াল বলেন, ‘এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান আগেও কয়েকবার জানানো হয়েছে। বিষয়টি ভারত তার প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করে দেখছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে তা জানানো হবে।’

শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘হাদি হত্যা মামলা একটি আইনি ও বিচারিক বিষয়। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি: ইউএনবি

তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠক

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। এর এক দিন আগে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সোমবার তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ত্রিবেদী। এর আগে রোববার তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

গতরাতে এক ফেসবুক পোস্টে ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, ত্রিবেদী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গঠনমূলক ও জনকেন্দ্রিক উপায়ে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে মোদির দিকনির্দেশনা চেয়েছেন।

সোমবার তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ত্রিবেদী মোদির শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী উপায়ে কাজ করার জন্য ভারতের অঙ্গীকারের কথা জানান বলে ভারতীয় হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানায় ঢাকা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হন।

এ ছাড়া, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্তদেরও ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে উপস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ জানায় ঢাকা। এতে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

গত ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে এক গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এতে ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

এর মধ্যেই সোমবার ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। ত্রিবেদীর নয়াদিল্লি সফরও এই সফরের পরপরই হলো।

একের পর এক কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে চলছে, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, তা বিবেচনা করছে বাংলাদেশ সরকার।

সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়।’ তিনি বলেন, ‘ভারত এর আগে ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তবে সফরের কোনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা সম্ভবত তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরকে ব্রিকস সম্মেলনে সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইতে পারে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল বলেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে সরকার তার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে সব ধরনের আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আদালত যে রায় দেবেন, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ সবার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।’

সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রসঙ্গে জাহেদ বলেন, ‘তিনিও পূর্ণ নিরাপত্তায় বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারবেন।’

জাহেদ বলেন, ‘তিনি হয়তো একজন ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু তিনি একজন নষ্ট ও পচা মানুষ, যিনি হাসিনার সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিলেন এবং এখনো আছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশে আবার হাসিনার মতো কোনো মাফিয়া শাসন দেখতে চাই না, ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী বা মাফিয়া শাসন হতে দেব না। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।’

র-এর প্রধানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহেদ মানুষকে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করার আহ্বান জানান। তিনি এটিকে দুই প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে জাহেদ বলেন, ‘হাসিনা সরকারের সময় বাংলাদেশে ভারতীয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কাজ করত, ভবিষ্যতে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।’