লুকিয়ে বিদেশ গিয়ে গোপনে ফিরেছেন যে বিশ্বনেতারা

মোজাক্কির রিফাত
মোজাক্কির রিফাত

ক্ষমতার দম্ভ, গোয়েন্দা নজরদারির নিখুঁত জাল কিংবা রাজনীতির পিচ্ছিল গতিপথের সংযোগে ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কিছু অধ্যায় সামনে আসে, যা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। রাষ্ট্রক্ষমতা হারানো বা চরম রাজনৈতিক সংকটের মুখে অনেক নেতাকেই ছাড়তে হয়েছে নিজ দেশ। কেউ আবার দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ফিরেছেন নতুন রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে। এই যাওয়া-আসার খেলায় কেউ ব্যবহার করেছেন সাধারণ শ্রমিকের ছদ্মবেশ, কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পণ্যবাহী ট্রাকের পেটে, আবার কেউ হেলিকপ্টারে চড়ে চোখের পলকে সীমান্ত পার হয়েছেন।

ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এমন কিছু বিশ্বনেতার গোপন প্রস্থান, ছদ্মবেশ এবং নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের অবিশ্বাস্য সব কাহিনী কেমন ছিল?

ভ্লাদিমির লেনিন: সিলড ট্রেনের সফর

ইউরোপের বুকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের একটি ছিল রুশ বিপ্লব। এর মূল কারিগর ছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন।

Image
Lenin_in_1920
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। ছবি: সংগৃহীত

১৯১৭ সালের বসন্ত। ইউরোপ তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে। অন্যদিকে রাশিয়ার রাজধানী পেট্রোগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা জারতন্ত্রের পতন ঘটেছে। কিন্তু নির্বাসিত বলশেভিক নেতা লেনিন তখন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে আটকে আছেন। রাশিয়ার মাটিতে ফেরার জন্য তিনি ব্যাকুল। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফেরার সব পথই প্রায় বন্ধ।

ইতিহাসবিদ জোশুয়া হ্যামারের ‘স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং হিস্ট্রি ডটকমের আর্কাইভ থেকে জানা যায়, সুইজারল্যান্ড থেকে রাশিয়ায় ফেরার জন্য লেনিন জার্মান সরকারের সঙ্গে একটি অভাবনীয় ও বিতর্কিত চুক্তি করেছিলেন।

জার্মানি তখন রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। জার্মান নীতিনির্ধারকেরা মনে করেছিলেন, বলশেভিকদের রাশিয়ায় ফেরত পাঠাতে পারলে তারা দেশটির ভেতরে যুদ্ধবিরোধী বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। এতে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল হবে। এই কৌশলগত স্বার্থেই লেনিন ও তার ২৯ জন রুশ বিপ্লবী সহযোগীকে জার্মানির ওপর দিয়ে ভ্রমণের অনুমতি দেয় দেশটির সরকার। তাদের মধ্যে ছিলেন লেনিনের স্ত্রী নাদেজদা ক্রুপস্কায়া এবং বিপ্লবী গ্রিগরি জিনোভিয়েভ।

লেনিনের যাত্রাপথের মানচিত্র। ছবি: সংগৃহীত

১৯১৭ সালের ৯ এপ্রিল। জুরিখ স্টেশন থেকে একটি বিশেষ ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়। ট্রেনটির কামরাগুলো ছিল ‘সিলড’ বা সিলগালা করা। উদ্দেশ্য ছিল, লেনিন বা তার দলের কেউ যেন জার্মান কোনো নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন।

ট্রেনটি জার্মানি অতিক্রম করে বাল্টিক সাগরের তীরে রস্টক বন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে তারা ‘কুইন ভিক্টোরিয়া’ নামের একটি সুইডিশ ফেরিতে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুইডেনের ত্রেলেবোর্গে পৌঁছান। এরপর স্টকহোম হয়ে তারা সুইডেনের প্রায় ৭০০ মাইল উত্তরের সীমান্ত শহর হাপারান্দায় যান। সেখান থেকে রাতের অন্ধকারে ঘোড়ায় টানা স্লেজগাড়িতে করে বরফে জমাট তোর্নে নদী পার হন লেনিন ও তার সঙ্গীরা। এরপর প্রবেশ করেন ফিনল্যান্ডে, যা তখন রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

অবশেষে ১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল রাতে লেনিন পেট্রোগ্রাদের ফিনল্যান্ড স্টেশনে এসে পৌঁছান। সেখানে হাজারো শ্রমিক, সৈন্য ও নৌবাহিনীর সদস্য লাল পতাকা নিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান। স্টেশনের বাইরে একটি সাঁজোয়া গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে লেনিন ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। পরে এই ভাষণ ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে পরিচিত হয়। তিনি বুর্জোয়া সাময়িক সরকার উৎখাত করে ‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতদের হাতে’ দেওয়ার আহ্বান জানান।

Image
Lenins Train
ছবি: সংগৃহীত

এখানেই শেষ নয়।

জুলাইয়ে সরকারের দমনপীড়নের মুখে বলশেভিকদের ‘জার্মান এজেন্ট’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। লেনিনের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তাই এবারও তাকে ছদ্মবেশ নিতে হয়।

তিনি দাড়ি কামিয়ে, মাথায় পরচুলা পরে শ্রমিকের বেশ ধারণ করেন। এই ছদ্মবেশেই তিনি পালিয়ে ফিনল্যান্ডে যান।

এরপর অক্টোবর বিপ্লবের ঠিক আগের দিন, ১৯১৭ সালের ২৪ অক্টোবর রাতে সেই ছদ্মবেশী লেনিন পুলিশের নিরাপত্তা চৌকি ফাঁকি দিয়ে গোপনে বলশেভিক বিপ্লবের সদর দপ্তর ‘স্মলনি ইনস্টিটিউটে’ প্রবেশ করেন।

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসবিদ অরল্যান্ডো ফাইজেসের ‘লেনিন অ্যান্ড দ্য অক্টোবর কুপ’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, তার এই চূড়ান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরই ২৫ অক্টোবর বলশেভিক রেড গার্ডরা উইন্টার প্যালেস দখল করে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়।

একটি সাধারণ ট্রেনের কামরা এবং একটি ছদ্মবেশ কীভাবে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে পারে, লেনিনের জীবনী তার বড় উদাহরণ।

কাবুলের পথে নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ

উপমহাদেশের বিপ্লবের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমহর্ষক ও অবিস্মরণীয় মহান প্রস্থানগুলোর একটি ঘটে ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন কলকাতার এলগিন রোডের নিজস্ব বাসভবনে গৃহবন্দি, বাড়ির বাইরে ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা পুলিশ ও গুপ্তচরদের কড়া পাহারা।

Image
Subhas_Chandra_Bose_NRB
ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ১৯৪০ সালের শেষ দিকে নেতাজি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আসবে না। তার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ও একটি সশস্ত্র সেনাবাহিনী প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

নেতাজির এই দুঃসাহসিক দেশত্যাগ এবং তার বিখ্যাত ‘জিয়াউদ্দিন’ ছদ্মবেশের খুঁটিনাটি বিবরণ পাওয়া যায় তার নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারকারী সংস্থা বা প্ল্যাটফর্ম ‘মাইধ্যান’ পোর্টালের আর্কাইভ ও ঐতিহাসিক বিবরণে।

১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি মধ্যরাত। এলগিন রোডের বাড়িতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিতে নেতাজি এক অবিশ্বাস্য ছদ্মবেশ ধারণ করেন। লম্বা দাড়ি ও মুসলিম সংস্কৃতির পোশাক পরে তিনি নিজেকে সাজান ‘মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন’।

জিয়াউদ্দিন সেই সময়ে একটি বিমা কোম্পানির সাধারণ ট্রাভেলিং এজেন্ট ছিলেন। এই সাধারণ পরিচয়ই হয়ে ওঠে নেতাজির মুক্তির চাবিকাঠি।

Image
escape
ছবি: সংগৃহীত

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৭ জানুয়ারি রাত দেড়টার দিকে নেতাজি এলগিন রোডের বাড়ি থেকে গোপনে বের হন। পুরো পরিবারকেও বিষয়টি গোপন করা হয়েছিল। শুধু কয়েকজন বিশ্বস্ত সহচর এই ঘটনা সম্পর্কে জানতেন। গাড়ির চালকের আসনে ছিলেন তার ভাইপো ড. শিশির বসু। তিনি দক্ষ চালক ছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় পুলিশের সন্দেহের তালিকায়ও ছিলেন না। শিশির আগেই যাত্রাপথ রেকি করে রেখেছিলেন।

গভীর রাতে নিস্তব্ধ কলকাতার রাজপথ পেরিয়ে সাদা রঙের গাড়িটি ছুটে চলে বিহারের বারারীর দিকে। সেখানে নেতাজি তার আরেক ভাইপো ড. অশোক নাথ বসুর বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এরপর গাড়িতে করে তারা পৌঁছান গোমোহ স্টেশনে।

গোমোহ স্টেশন থেকে ছদ্মবেশী জিয়াউদ্দিন চড়ে বসেন ঐতিহাসিক ‘দিল্লি-কালকা মেইল’ ট্রেনে। ১৯ জানুয়ারি ট্রেনটি পেশোয়ার ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছালে নেতাজির মহানিষ্ক্রমণের প্রথম পর্ব শেষ হয়।

পেশোয়ারে মুসলিম লীগ নেতা মিয়াঁ আকবর শাহ তাকে স্বাগত জানান। তার পরামর্শে নেতাজিকে তাজমহল হোটেলে রাখা হয়। পরে তিনি আবাদ খানের বাড়িতে অবস্থান নেন। কিন্তু পেশোয়ার থেকে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত যাত্রা ছিল আরও কঠিন ও বিপজ্জনক। নেতাজি পশতু বা স্থানীয় কোনো উপভাষা জানতেন না। ফলে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল প্রবল।

‘মাইধ্যান’ পোর্টাল ও নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আকবর শাহ এই সমস্যার সমাধানে একটি কৌশল বের করেন। নেতাজিকে ‘বধির ও বোবা’ পাঠান সাজানো হয়। তার সঙ্গী ও পথপ্রদর্শক হন ভগতরাম তলোয়ার। তিনি ‘রহমত খান’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। প্রচার করা হয়, বোবা-কালা জিয়াউদ্দিনকে চিকিৎসার জন্য আড্ডা শরিফের একটি অলৌকিক মাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

Image
Netaji_house_kolkatta
নেতাজি হাউজ, কোলকাতা। ছবি: সংগৃহীত

এই ছদ্মবেশে ভগতরাম তলোয়ার ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পেশোয়ার থেকে প্রায় ২০০ মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ৩১ জানুয়ারি আফগানিস্তানের কাবুলে পৌঁছান। এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অধিকাংশ পথ তাদের হাঁটতে হয়েছিল দুর্গম পাহাড়ি রুটে। অনেক সময় তাদের কাছে পর্যাপ্ত খাবার বা আশ্রয়ও ছিল না।

কাবুলে পৌঁছে তারা লাহোরি গেটের কাছে একটি অত্যন্ত সাধারণ ও নোংরা সরাইখানায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে বিশ্বমঞ্চে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তোলার মহাকাব্যিক অধ্যায়।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাকের ডগা দিয়ে নেতাজির এই চুপিচুপি দেশত্যাগ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় পরিবর্তনকারী একটি মাইলফলক।

পরবর্তীতে, ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বরে নেতাজি জাপানের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ওই দুটি দ্বীপের নাম দেন ‘শহীদ’ ও ‘স্বরাজ’। ১৯৪৪ সালে তার সেনাদল ব্রিটিশ ভারতকে মুক্ত করতে বার্মা সীমান্ত পেরিয়ে মণিপুরের মৈরাং ও নাগাল্যান্ডের কোহিমা পর্যন্ত এগোলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রসদ সংকটে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

শার্ল দ্য গল: প্যারিস থেকে উধাও

১৯৬৮ সালের মে। ফরাসি ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও সংকটময় সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক এবং ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল শার্ল দ্য গল তখন ক্ষমতার ১০ বছর পূর্ণ করেছেন। ঠিক এই সময় নানতেরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ওপর দমনপীড়নের প্রতিবাদে প্যারিসের রাস্তায় শুরু হয় গণআন্দোলন।

Image
De_Gaulle-OWI
ছবি: সংগৃহীত

মে মাসের মাঝামাঝি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘটে রূপ নেয়। এতে প্রায় ১ কোটি ফরাসি শ্রমিক যোগ দেন। অচল হয়ে পড়ে পুরো ফ্রান্স। বন্ধ হয়ে যায় কলকারখানা ও যোগাযোগব্যবস্থা।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালের ২৯ মে সকালে ফ্রান্সের বুকে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। সকালের মন্ত্রিসভা বৈঠক বাতিল করা হয়। কিছুক্ষণ পরই ফরাসি প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিজি প্রাসাদ থেকে খবর আসে, রাষ্ট্রপতি উধাও!

এলিজি প্রাসাদের কর্মীরা তো বটেই, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাও জানত না যে কোথায় গেছেন দ্য গল। প্যারিসের রাজপথে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রাষ্ট্রপতি হয়তো পদত্যাগ করেছেন, অথবা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা উল্লসিত হয়ে প্যারিসের রাস্তা দখল করে নেয়।

আসলে কী ঘটেছিল সেই কয়েক ঘণ্টায়?

ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, দ্য গল অত্যন্ত গোপনে এলিজি প্রাসাদ থেকে বের হয়ে একটি হেলিকপ্টারে ওঠেন। তবে তিনি ফ্রান্সের অন্য কোথাও যাননি। তার হেলিকপ্টার সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিম জার্মানির ব্যাডেন-ব্যাডেনে অবতরণ করে। সেখানে ফরাসি দখলদার বাহিনীর একটি সামরিক ঘাঁটি ছিল। এর প্রধান ছিলেন জেনারেল জ্যাক মাসু।

ছবি: সংগৃহীত

দ্য গল আসলে দেখতে চেয়েছিলেন, সংকটের চরম মুহূর্তে সেনাবাহিনী তার পাশে আছে কি না। তিনি গোপনে জেনারেল জ্যাক মাসুর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখান থেকে নিশ্চিত হন, প্যারিস যদি বিপ্লবীদের দখলে চলে যায়, তাহলে ফরাসি সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতির আদেশে প্যারিস পুনরুদ্ধারে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে।

সামরিক সমর্থন নিশ্চিত করার পর দ্য গল একইভাবে গোপনে হেলিকপ্টারে করে ৩০ মে প্যারিসে ফিরে আসেন এবং জাতির উদ্দেশে রেডিও ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। বরং ফরাসি জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করবেন।

ছবি: সংগৃহীত

তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেন, দেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে এবং প্রয়োজনে সেনা নামানো হবে।

এই ভাষণের পরই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। দেশের সাধারণ মানুষ, যারা স্থায়িত্ব চাচ্ছিল, তারা দ্য গলের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে। জুনের নির্বাচনে দ্য গলের দল বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে।

এলিজি প্রাসাদ থেকে উধাও হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই রাজনৈতিক চাল দ্য গলের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাস্টারস্ট্রোক হয়ে ওঠে।

হেনরি কিসিঞ্জার: বেইজিংয়ের গোপন সফর

বিশ্বরাজনীতিতে এমন কিছু গোপন দেশত্যাগ ও মিশন থাকে, যেগুলো বিশ্ব ইতিহাসের বড় কূটনৈতিক মেলবন্ধনের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান থেকে চীনে এমনই এক গোপন সফর করেন।

ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার চায়না ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন চীন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দুই দেশেরই দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুং একটি গোপন কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করেন। এই ঐতিহাসিক বরফ গলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় হেনরি কিসিঞ্জারকে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির দ্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি আরকাইভে এই ঐতিহাসিক ও গোপন সফরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

১৯৭১ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কিসিঞ্জার সরকারি সফরে এশিয়ায় আসেন। তার পূর্বনির্ধারিত গন্তব্য ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তান। ৮ জুলাই তিনি যখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছান, তখনই ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোপন এই মিশন শুরু হয়। এর কোডনেম ছিল ‘অপারেশন মার্কোপোলো’।

Image
Henry_A._Kissinger,_U.S._Secretary_of_State,_1973-1977
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামাবাদে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ডাকা রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় হঠাৎ অসুস্থতার ভান করেন কিসিঞ্জার। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রচণ্ড গরমে কিসিঞ্জার পেটের সমস্যায় ভুগছেন। তাকে সুস্থ করার জন্য পাহাড়ি ও শীতল পরিবেশের স্বাস্থ্যনিবাস নাথিয়াগালিতে পাঠানো হবে।

কিন্তু পুরো ঘটনাটিই ছিল পরিকল্পিত নাটক।

৯ জুলাই ভোরেও সাংবাদিক ও গোয়েন্দারা ভাবছিলেন, কিসিঞ্জার নাথিয়াগালিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। অথচ ওই সময়ে তিনি গোপনে ইসলামাবাদের চকলালা বিমানঘাঁটিতে চলে যান। নিজের পরিচিত স্যুট ও চশমা বদলে তিনি সাধারণ পোশাক পরেন এবং বড় রোদচশমায় চোখ ঢেকে নেন। এরপর পাকিস্তানি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭০৭ উড়োজাহাজে চড়ে গোপনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকারী।

কিসিঞ্জার বেইজিংয়ের নানইউয়ান বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করলে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই তাকে অত্যন্ত গোপনে স্বাগত জানান। এরপর বেইজিংয়ের ডিয়াওয়ুতাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে টানা ৪৮ ঘণ্টা অতি গোপনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি চলে।

Image
henry
ছবি: সংগৃহীত

এই বৈঠকেই কিসিঞ্জার চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের খসড়া তৈরি করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বেইজিং সফরের ঐতিহাসিক ভিত্তিও তৈরি হয়।

১১ জুলাই কিসিঞ্জার একইভাবে গোপনে ইসলামাবাদে ফিরে আসেন। এরপর নাথিয়াগালি থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার ভান করে নিয়মিত সরকারি কর্মসূচিতে যোগ দেন।

এই গোপন সফর ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের খবর ১৫ জুলাই টেলিভিশনে ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। এতে সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিসিঞ্জারের এই গোপন কূটনীতি বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনে।

কার্লেস পুজদেমঁ: ‘খাঁচা’ ভেঙে ফেরা

নিকট অতীতের দিকে তাকালে কাতালোনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজদেমঁ-এর ঘটনা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সাড়া জাগানো ঘটনাগুলোর একটি।

সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে স্প্যানিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাতালোনিয়ায় স্বাধীনতার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিলেন পুজদেমঁ। স্পেনের সংবিধান আদালত সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অর্থ আত্মসাতের মামলা হয়।

Image
Carles_Puigdemont_2024
ছবি: সংগৃহীত

গ্রেপ্তার এড়াতে ২০১৭ সালে পুজদেমঁ গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বেলজিয়ামের ওয়াটারলুতে নির্বাসিত জীবন শুরু করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে স্প্যানিশ সরকার কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা আইন বা অ্যামনেস্টি বিল পাস করে। কিন্তু স্প্যানিশ সুপ্রিম কোর্ট পুজদেমঁ-এর অর্থ আত্মসাতের মামলাকে এই ক্ষমার আওতার বাইরে রাখে। ফলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল থাকে।

এই পরিস্থিতিতে পুজদেমঁ ঘোষণা করেন, কাতালোনিয়ার নতুন আঞ্চলিক সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি বার্সেলোনায় ফিরবেন।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। বার্সেলোনার আঞ্চলিক সংসদের বাইরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কট্টর সমর্থক। অনুষ্ঠানস্থলের চারপাশে কাতালান পুলিশ ‘মোসোস দ্য এসকুয়াদ্রার’ ৩০০-এর বেশি চৌকস এজেন্টও মোতায়েন ছিল। পুজদেমঁ কীভাবে আসেন, সবার চোখ ছিল সেদিকেই।

ঠিক সকাল ৯টায় মঞ্চের পেছনের অন্ধকার গলি থেকে চশমা পরা ও পরিচিত হেয়ারস্টাইলের কার্লেস পুজদেমঁ নাটকীয়ভাবে এগিয়ে আসেন। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, বিগত সাত বছর ধরে আমাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে। কারণ, আমরা কাতালান জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে চেয়েছিলাম।

ছবি: সংগৃহীত

তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগঘন ভাষণ শেষ হতেই শুরু হয় আসল রোমাঞ্চ।

ভাষণ শেষ করে পুজদেমঁ মঞ্চ থেকে নামতেই সমর্থকরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে মানবপ্রাচীর তৈরি করেন। পুলিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে পুজদেমঁ সাদা রঙের একটি সেডান গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসেন। গাড়িটির জানালায় ছিল কালো ফিল্টারযুক্ত কাঁচ।

কাতালান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন ধরে নিয়েছিলেন, পুজদেমঁ সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশ করবেন, ঠিক তখনই গাড়িটি ভিড় ঠেলে হাইওয়ের দিকে ছুটে যায়।

পুলিশ যখন বুঝতে পারে পুজদেমঁ তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

এরপর স্প্যানিশ পুলিশ কাতালোনিয়াজুড়ে ‘অপারেশন গ্যাবিয়া’ বা ‘অপারেশন খাঁচা’ নামে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। সব হাইওয়ে, ফরাসি সীমান্ত, বিমানবন্দর ও বন্দরে ব্যারিকেড বসানো হয়। আকাশে ওড়ানো হয় ড্রোন ও হেলিকপ্টার।

ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু, পুলিশের নজর এড়াতে পুজদেমঁ-এর অনুসারীরা ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেন। তারা আরেকটি একই রকম সাদা সেডান গাড়ি ব্যবহার করে পুলিশের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন।

৯ আগস্ট পুজদেমঁ-এর আইনজীবী গঞ্জালো বোয়ে সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’ ও ‘দ্য গার্ডিয়ানকে’ নিশ্চিত করেন, পুজদেমঁ সফলভাবে স্পেনের সীমান্ত পেরিয়ে আবার বেলজিয়ামের ওয়াটারলুতে তার সেফ হাউসে ফিরে গেছেন।

তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে বার্সেলোনার প্রকাশ্য জনসভা থেকে পুজদেমঁ-এর উধাও হয়ে যাওয়া এবং স্পেন সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়াকে কাতালান পুলিশের কমান্ডাররা নিজেদের ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক উপহাস’ ও চরম লজ্জাজনক ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

ম্যানুয়েল জেলায়া: পাহাড়ি পথে দেশে ফেরা

লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে ২০০৯ সালের হন্ডুরাসের অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রপতি ম্যানুয়েল জেলায়ার গোপন প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটিও যেন এক পরাবাস্তব রূপকথার গল্প।

২০০৯ সালের জুনে সেনাসমর্থিত অভ্যুত্থানে জেলায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেনা সদস্যরা তাকে রাতের পোশাকেই কোস্টারিকায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।

ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু এই একগুঁয়ে বামপন্থী নেতা এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ ছিলেন না। তিন মাস নির্বাসনে থাকার পর ২০০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জেলায়া সিদ্ধান্ত নেন, তিনি দেশে ফিরবেন। কিন্তু ততক্ষণে হন্ডুরাসের সব বিমানবন্দর ও সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

জেলায়া এবার বেছে নেন দুঃসাহসী এক ছদ্মবেশ। তার চিরচেনা বড় সাদা কাউবয় হ্যাটটি খুলে মাথায় দেন সাধারণ টুপি। চোখে চশমা পরে নিজেকে সাজান একেবারে সাধারণ এক পাহাড়ি কৃষকের মতো।

এই ছদ্মবেশে তিনি দুর্গম পাহাড়ি পথে টানা ১৫ ঘণ্টা কাদা-মাটি মাড়িয়ে হন্ডুরাসের সীমান্ত পার করেন। সঙ্গে ছিলেন মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী।

এরপর রাজধানী তেগুসিগালপায় গিয়ে নাটকীয়ভাবে ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সেখানে নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করলে হন্ডুরাসের সামরিক সরকারের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যায়। তারা ব্রাজিল দূতাবাসের বাইরে সৈন্য মোতায়েন করে এক অদ্ভুত অবরোধ তৈরি করে।

Image
zaleya
ছবি: সংগৃহীত

গার্ডিয়ানের বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জেলায়াকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য হন্ডুরাসের সামরিক বাহিনী দূতাবাসের চারপাশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাউডস্পিকারও বসায়। সেখানে ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত কর্কশ কণ্ঠে মেক্সিকান গায়িকা পাকিটা লা দেল ব্যারিওর বিখ্যাত গান ‘রাতা দে দোস পাতাস’ বাজানো হতে থাকে। গানটির অর্থ ‘দুই পাওয়ালা ইঁদুর’।

এ ছাড়া, শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে অত্যাচার এবং অতিবেগুনি রশ্মির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয় দূতাবাসের ভেতর। এদিকে জেলায়া জানালাগুলো অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে মুড়ে দেন, যাতে কোনো ক্ষতিকর রশ্মি বা লিসেনিং ডিভাইস কাজ করতে না পারে।

এই বন্দিদশার মধ্যেও জেলায়া তার রাষ্ট্রপতির আভিজাত্য ধরে রেখেছিলেন। দূতাবাসের সংকীর্ণ কক্ষের ভেতর তার ব্যক্তিগত বডিগার্ড এডুয়ার্ডো মুনোজ এক রাজকীয় আচার পালন করতেন। জেলায়া যখন তার বিখ্যাত সাদা কাউবয় হ্যাটটি মাথা থেকে খুলতেন, মুনোজ সেটি রাজমুকুটের মতো অত্যন্ত ভক্তিভরে দুই হাতে ধরে রাখতেন।

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ চার মাস ব্রাজিল দূতাবাসের ভেতর এই পরাবাস্তব মানসিক যুদ্ধ চলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় জেলায়া অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পান।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: আমিরাতে গোপন কূটনীতি

বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় গোয়েন্দা নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে। এই অঞ্চলের যেকোনো দুটি দেশের মধ্যে কোনো গোপন সফর হলে তা বিশ্ব কূটনৈতিক মহলে বড় আলোড়ন তৈরি করে।

২০১৬ সালের মার্চে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অতি গোপন সফর ছিল তেমনই এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী অধ্যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ঠিক সেই সময় নেতানিয়াহু অত্যন্ত গোপনে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান।

এই সফরের খবর ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকজন অতি উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ছাড়া পৃথিবীর আর কারও জানা ছিল না। নেতানিয়াহু আবুধাবিতে পৌঁছানোর পর তাকে অত্যন্ত গোপনে আমিরাতের সীমান্ত শহর ‘আল আইন’-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি গোপন প্রাসাদে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকও করেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়াও। সেখানে মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে দুই দেশের গোপন কৌশলগত ও সামরিক জোট গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এই গোপন সফরের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে একটি অলিখিত সামরিক বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। ইসরায়েল গোপনে আবুধাবিতে তাদের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ও মিসাইল ব্যাটারি পাঠায়।

অন্যদিকে আমিরাতের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের লাভান দ্বীপে একটি গোপন ড্রোন হামলাও চালায় ইসরায়েল।

তবে এই গোপন সফরের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেয়।

তবু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই গোপন সফরই ছিল পরবর্তীতে ২০২০ সালে সই করা ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা ইসরায়েল-আমিরাত আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তির মূল ভিত্তি।

গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর এই গোপন যাত্রা ইতিহাসের পাতায় একটি রহস্যময় অধ্যায়।

ইতিহাসের এই দীর্ঘ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতাদের ছদ্মবেশ এবং গোপন প্রস্থান সবসময় ব্যক্তিগত ভীরুতা বা পলায়নের পরিচয় ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল রণকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এসব ঘটনার পরিণতিও অবশ্য এক ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোপন যাত্রা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, আবার কোথাও তা সাময়িক রাজনৈতিক আলোড়নের পর দীর্ঘমেয়াদি আইনি বা রাজনৈতিক জটিলতায় রূপ নিয়েছে।