২ দিনে ৫ দেশের মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা
প্রায় এক মাস কার্যত ‘চুপচাপ’ থাকার পর আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। গত দুই দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে ছয় মাস ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধ।
আজ বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার জেরে কৌশল বদল
গত রোববার থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমা হামলা চালাচ্ছে। এতে অন্তত ১৯ ইরানি নিহত হন।
এক পর্যায়ে হুমকির সুরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তার সামরিক বাহিনী ‘যখন খুশি তখনই ইরানে হামলা চালাতে পারে।’
তবে ট্রাম্পের এমন হুমকিতে ভয় না পেয়ে এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে শুরু করে তেহরান।
ইরানের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান মোহসেন রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধে ইরান একটি ‘নতুন কৌশল’ গ্রহণ করেছে, যা ‘আমেরিকানদের ভিত গুঁড়িয়ে দেবে’
মঙ্গলবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সিরিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তেহরানের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। এর পরই অঞ্চলজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
এরপরই ইরান দুই দিনের ব্যবধানে কুয়েত, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালায়।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলাটিকে এই যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক মানুষের হতাহতের অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মঙ্গলবার উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গোলার টুকরায় এক শিশুসহ চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এই হামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স মন্তব্য করেন, ‘আইআরজিসি বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে অভ্যস্ত হলেও মার্কিন সেনাবাহিনী কখনোই এমন করবে না।’
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শয়তান’ আখ্যা দেন।
এক্সে তিনি লেখেন, ‘কোনো শক্তি যদি শয়তানের মতো আচরণ করে, শয়তানের মতো লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় এবং শয়তানের মতো হত্যা করে, তাহলে তাদের সাক্ষাৎ শয়তান আখ্যা দেওয়া উচিত।’
ইরান সরকারের একটি অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর কুহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানের স্থানে ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। ভিডিওতে মানুষের চিৎকারও শোনা যায়।
কনের বাবা ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির মালিক আলি মাল্লাহি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।’ তার এ-সংক্রান্ত ভিডিওটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হয়নি।’
আগেই মিলেছিল কৌশল বদলের আভাস
গত রোববার থেকে নতুন করে দুই পক্ষের সংঘাত শুরু হয়। সেদিনই তেহরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে রাখছে ইরান। তাদের বিরত রাখতেই এই হামলা।
ইরান জানিয়েছে, রোববারের হামলায় ‘হতাহতের ঘটনা’ ঘটেছে। এর জবাবে তারা জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
গত ২০ আগস্ট সিএনএনের প্রতিবেদনে ইরানের যুদ্ধকৌশল বদলানোর আভাস দেওয়া হয়েছিল।
ইরানের উদারপন্থি নেতারা আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে উৎসাহী হলেও কট্টরপন্থিরা চান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে। আলোচনায় হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাও মেটেনি, আর সংঘাতও বন্ধ হয়নি। যার ফলে উদারপন্থিদের ওপর চাপ বাড়ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত রাখার নিজস্ব কৌশল তৈরি করে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, এই কৌশলে শত্রুর হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক অভিযানের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
গত ১৭ আগস্ট ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তি সমঝোতার কারণে হামলা বন্ধ থাকলেও ইরানের কট্টরপন্থি নেতারা কূটনীতির বদলে গোপনে যুদ্ধের কলেবর বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ লক্ষ্যে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সামরিক নিয়ন্ত্রণও বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।
অভিজ্ঞ সামরিক জেনারেলদের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদে বসানোর কাজও সেরে নিয়েছে ইরান—এমন দাবি করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মোহসেন রেজায়ির ‘নতুন কৌশল’ ঘোষণার পর দুই দিনের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি ভিন্ন স্থানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত হামলা ইরানের সেই কৌশল বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

