ইয়েমেন এখন ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধের মাঠ: হুতি দমনে সৌদির ৩২ বিমান হামলা
ইয়েমেনে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা অভিযান শুরু করার পর লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হামলার পর কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন ধরে যায় এবং কিছু স্থাপনার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। সৌদি আরব এ ঘটনাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এএফপি বলছে, হুতিদের হামলার এক দিন পর বুধবার বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, সৌদি বিমানবাহিনী ইয়েমেনের মারিব, আল-জাওফ, তাইজ ও হোদেইদা প্রদেশে ৩২টি বিমান হামলা চালিয়েছে। হুতিদের আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের দাবি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এসব হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। সেই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তিতে রূপ না নিলেও কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করে। তাইজ, আল-বায়দা ও আল-জাওফ প্রদেশে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। আল-জাওফকে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে দেখা হয়। হুতিরা দাবি করেছে, তারা সরকারি বাহিনীর কয়েকটি অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে।
সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য
আল জাজিরা বলছে, ইয়েমেন সরকারের এবারের অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সানা পুনর্দখল। রাজধানীটি দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারপন্থী বাহিনী আগের তুলনায় বেশি সংগঠিত হয়েছে। এর আগে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছ থেকে দক্ষিণ ইয়েমেনের কিছু এলাকা পুনর্দখল করে। এরপর সরকারবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে হুতিদের সামরিক সক্ষমতাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, তারা সহজে পিছু হটবে না। সরকারি বাহিনীর চাপ বাড়লে হুতিরা উত্তরাঞ্চলের সাদা, হাজ্জাহ, সানা ও আশপাশের পার্বত্য এলাকায় নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে সরে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
ফলে এবারের সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রিত পৃথক ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একজন ইয়েমেন-বিষয়ক বিশ্লেষক এটিকে সিরিয়ার মতো দ্রুত পতনের বদলে সুদানের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল সংঘাতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলা
ইয়েমেনে স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি সৌদি আরবেও হুতিদের হামলা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরে হামলা চালানো হয়। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কয়েকটি স্থাপনা এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার পর কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। জরুরি ও অগ্নিনির্বাপণ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হুতিদের হামলা দেশটির সার্বভৌমত্বের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, হামলা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হুতিরা বলছে, সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই তারা এসব হামলা চালিয়েছে। গত জুলাই থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর হুতিরা দেশটির জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বাব আল-মান্দেব নিয়ে লড়াই
ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিরা ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। এবারের সংঘাতে পশ্চিম তাইজ ও দক্ষিণ হোদেইদার দিকে তাদের অগ্রযাত্রার অন্যতম লক্ষ্য ছিল আল-মাখা (মোখা) ও বাব আল-মান্দেবের দিকে পৌঁছানো।
ইয়েমেন সরকারের জন্যও প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সমর্থনে সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের পেছনে হুতিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
এই জলপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত হওয়ার কারণে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বাব আল-মান্দেবেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব
আল জাজিরা আরও জানিয়েছে, ইয়েমেনের যুদ্ধ এবার শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের সঙ্গে হুতিদের কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। লোহিত সাগরের নৌপথ, সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এত দিন রিয়াদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনে আবারও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া। কিন্তু সৌদি ভূখণ্ড ও জ্বালানি স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা হলে দেশটির জন্য সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানও হুতিদের সহায়তা বাড়াতে কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে তেহরানের সামরিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ, পরিশোধিত জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তেলের বাজারেও প্রভাব
সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার খবর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় এক ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও দুই ডলারের বেশি বেড়ে ৯৩ দশমিক ৬৫ ডলারে পৌঁছায়।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব একই সময়ে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে কমে এসেছে, আর বাব আল-মান্দেবেও চলাচল কিছুটা কমেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইয়েমেনে বর্তমান সংঘাত দ্রুত থামার পরিবর্তে আরও বিস্তৃত হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবার প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেছে এবং একাধিক ফ্রন্টে অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে হুতিদের হাতে এখনো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।
ফলে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াই শুধু সানা দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সৌদি আরব, ইরান এবং লোহিত সাগরের নৌপথকে ঘিরে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
