ইরাক থেকে মার্কিন জোটের বিদায়, নতুন শক্তির উত্থানের আশঙ্কা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো সেনা নেই।

বুধবারের মধ্যে পূর্ণ প্রত্যাহার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তার এক দিন আগেই শেষ মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহারকে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে ইরাকের কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ায় দেশটিতে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং নিরাপত্তার শূন্যতা কাজে লাগিয়ে ইসলামিক স্টেট (আইএস) আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায় ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। এর ফলে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি আর থাকছে না।

ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার ভাষায়, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের ‘একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি’ উদযাপন করা হবে।

তবে ইরাকের সবাই যে দ্রুত মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে স্বস্তি বোধ করছেন, তা নয়। ফালুজ্জার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই রয়টার্সকে বলেন, ইরাক এখনো নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।

তার মতে, পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ইরাকিদের আকাঙ্ক্ষা হলেও হঠাৎ করে মার্কিন জোটের চলে যাওয়ার ফলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরাকের নাজাফে কবরস্থান থেকে ইমাম আলী মাজারের দিকে যাওয়া সড়কে মার্কিন সেনাবাহিনীর ১ম ক্যাভালরি ডিভিশনের একটি ব্র্যাডলি সাঁজোয়া যান। ছবি: রয়টার্স

আইএস সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা

ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সুপ্ত নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হতে পারে।

কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও ড্রোন সহায়তা না থাকলে আইএস পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।

তার দাবি, জোটের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আইএসের সুপ্ত সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের সময় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও আইএস এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

ইরাকের মসুলে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মাখমুর এলাকায় সামরিক ঘাঁটিতে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সদস্য। ছবি: রয়টার্স

সাড়ে ৪ হাজার মার্কিন নিহত

২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তারা দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ দমনে লড়াই করে। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর আবারও ইরাকে মার্কিন বাহিনী ফিরে আসে। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেয় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৭ সালে ইরাক আইএসের স্বঘোষিত খেলাফতের সামরিক পরাজয় ঘোষণা করে।

রয়টার্সের হিসাবে, ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। চলতি বছর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেও ইরাকে সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবে বলছে ইরান

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বিজয় হিসেবে দেখছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসময় অঞ্চলটি ছেড়ে যাবে, কিন্তু ইরান ও তার প্রতিবেশীরাই সেখানে থেকে যাবে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দামও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছেন।

তার দাবি, মার্কিন বাহিনী ও বিদেশি সেনা চলে গেলে ইরাকে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াগুলোর বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছে। সম্প্রতি সৌদি আরবও জানিয়েছে, দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলার উৎস ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ছিল। বাগদাদ ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের মন্তব্য

এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে। ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ইরান ‘খুব খারাপভাবে ব্যর্থ হচ্ছে’ এবং দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।