ট্রাম্পের ‘ব্যর্থ’ গাজা পরিকল্পনা: বন্ধ হয়নি ইসরায়েলি হামলা, নিরস্ত্র হয়নি হামাস
গাজা যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বছর আগের পরিকল্পনাটি থমকে গেছে। এখনো ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালাচ্ছে এবং উপত্যকাটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তাদের দখলে। সেখানকার ফিলিস্তিনিরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পরিকল্পনাটির প্রথম ধাপের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলায় অপহৃত সর্বশেষ জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা শত শত ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি নিশ্চিত হয়েছিল।
তবে হামাসকে নিরস্ত্র করা, ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠনের মতো অন্যান্য লক্ষ্যগুলো এখনো অনেক দূরে।
পরিকল্পনায় যা ছিল
ট্রাম্পের ২০-দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত ছিল—সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত করা, উপত্যকার কিছু অংশ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তি এবং ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো।
পরের ধাপগুলোতে হামাসকে নিরস্ত্র করার এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন একটি শান্তি পর্ষদের তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনিদের দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পরিকল্পনা ছিল।
এর সঙ্গে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সের’ (আইএসএফ) কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, গাজার মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, তাদের জন্য পুরো এলাকাটি নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে।
যুদ্ধবিরতি কি টিকে আছে?
যদিও পূর্ণমাত্রায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু হয়নি, কিন্তু গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশই নারী ও শিশু। তবে মন্ত্রণালয়টি হামাস যোদ্ধাদের হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে না।
ইসরায়েল বলছে, তাদের হামলাগুলো হামাসকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তারা হামাসের বিরুদ্ধে পুনরায় হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া এবং অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ এনেছে। হামাস অবশ্য তা অস্বীকার করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে পাঁচ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
গাজার কতটা অংশ দখল করে আছে ইসরায়েল?
ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েলের বাহিনী গাজার ভেতরের তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ বা ইয়েলো লাইন পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, যার ফলে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু এরপর থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে ভূখণ্ডটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নিয়েছে।
এই হলুদ রেখা এগিয়ে যাওয়ার ফলে আরও অনেক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর ফলে ২০ লাখ মানুষ এখন উপকূলের খুব ছোট একটি জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে তারা তাবু ও ভাঙা ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইসরায়েল মদদপুষ্ট ফিলিস্তিনি মিলিশিয়ারা নিয়মিত হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা চালাচ্ছে।
ত্রাণ সহায়তা কি বেড়েছে?
গাজায় ত্রাণ সহায়তা বাড়লেও ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে জোরদার করা সত্ত্বেও গাজার ১২ লাখের বেশি মানুষ এখনো তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন।
আগস্টে এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি তথ্য দিয়ে দেখায় যে, যুদ্ধবিরতির শুরু থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২২৭টি ট্রাকে করে মানবিক ও বাণিজ্যিক সামগ্রী গাজায় প্রবেশ করেছে। এটি গাজা পরিকল্পনায় উল্লিখিত প্রতিদিনের ন্যূনতম ৬০০ ট্রাকের অর্ধেকের কম।
আইপিসির প্রতিবেদনে উল্লিখিত এই পরিসংখ্যান নিয়ে মন্তব্যের জন্য গাজায় প্রবেশের নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাটের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, প্রতিদিন মানবিক ও বাণিজ্যিক পণ্যবাহী প্রায় ৬০০ ট্রাক গাজায় ঢুকছে। গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট পণ্য পৌঁছাচ্ছে এবং তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছে।
তবে ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েল প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য গাজায় ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—তাঁবুর লোহার খুঁটি, ইঞ্জিনের তেল ও যন্ত্রাংশ। ইসরায়েলের যুক্তি হলো, হামাস এগুলো সামরিক কাজে ব্যবহার করতে পারে।
হামাস কি অস্ত্র সমর্পণে রাজি?
হামাসএমন ইঙ্গিত দিলেও, এটি বাস্তবায়নের জন্য গত জুলাই মাসে যে পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাও থমকে গেছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, হামাস ও গাজার অন্য যোদ্ধারা অস্ত্র ছাড়তে শান্তি পর্ষদের তৈরি করা ১৫ দফার একটি রূপরেখা মেনে নিয়েছে। হামাস অস্ত্র সমর্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীও পিছু হটবে। এরপর নতুন ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিলে আইএসএফ গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ট্রাম্প একে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলে অভিহিত করেছিলেন।
হামাস জানিয়েছে, তারা নিজেদের অস্ত্র হস্তান্তরে রাজি। এসব অস্ত্র জমা থাকবে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকারের কাছে। যদিও হামাস ‘অস্ত্র সমর্পণ বা নিস্ত্রীকরণ’ শব্দটি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবুও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে নেওয়া এই অবস্থান একসময় ছিল একেবারেই কল্পনাতীত।
তবে হামাস যে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে—এ নিয়ে ইসরায়েলের সন্দেহ রয়েছে। তাই তারা এই পরিকল্পনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না।
আইএসএফ কি গঠিত হয়েছে?
এই বাহিনীর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। তবে বাহিনীটি এখনো মাঠে নামেনি। এর একজন কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্স। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, আলবেনিয়া, কসোভো এবং উগান্ডা এই বাহিনীতে সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে।
জেফার্স জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এই বাহিনীতে ২০ হাজার সেনা থাকবে এবং তারা ১২ হাজার ফিলিস্তিনি পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেবে।
গাজা পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনিদের টেকনোক্র্যাট শাসনসংস্থা—'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা' গত জানুয়ারি মাসে গঠিত হয়। রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাআথকে এর প্রধান করা হয়েছে। তবে এই কমিটি এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি।
পুনর্গঠন কতদূর?
ট্রাম্পের পরিকল্পনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনিরা এখনো তাঁবু কিংবা আশ্রয়স্থল বানানোর জন্য ভাঙা ঘরের আবর্জনার মধ্যে লোহালক্কড় বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কুড়িয়ে বেড়াচ্ছেন।
গাজার পুনর্গঠন কাজ শুরু করার জন্য গত সেপ্টেম্বর মাসে শান্তি পর্ষদ ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ খুবই সামান্য।
শান্তি পর্ষদ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের গত এপ্রিলের একটি মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে অনুমান করা হয়েছিল যে আগামী এক দশকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিকরা কী বলছেন?
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় ফিলিস্তিনিদের থাকার কথা বলা হলেও, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতারা 'স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের' কথা বলে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে পুরোপুরি তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি আরও জোরালো করেছেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গত মাসে বলেছেন, এই দেশান্তর প্রক্রিয়া ছাড়া 'শেষ পর্যন্ত গাজার কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নেই'।
গাজার বাসিন্দাদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হতে পারে—ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে গাজা থেকে 'স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ' তদারকির জন্য একটি দপ্তর স্থাপন করে।
আরব দেশগুলোর তীব্র বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ট্রাম্প পরে এই ধারণা থেকে সরে আসেন। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, জোর করে গাজার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর দেশটিতে এটিই প্রথম নির্বাচন।
শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতা ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমর্থনে কথা বলেছেন।
জনমত জরিপগুলো বলছে, নেতানিয়াহুপন্থী ও নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর মধ্যে কড়া লড়াই হতে চলেছে।

