আফ্রিকায় সেনা-অভ্যুত্থান ‘ভাইরাসের মতো’ ছড়িয়ে পড়ছে?
পশ্চিমের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আফ্রিকায় সেনা-অভ্যুত্থান যেন 'ভাইরাসের মতো' ছড়িয়ে পড়েছে। একেক দেশে এই 'ভাইরাস' ছড়িয়ে পড়ার কারণ একেক। এ নিয়ে বিশ্লেষকভেদে মতও ভিন্ন।
তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে: আগামীতে আফ্রিকার কোন দেশে সেনা-অভ্যুত্থান হতে পারে, তা নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া যায় কিনা এখন তাই ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের।
বর্তমানে আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়—পশ্চিমে আটলন্টিকের তীরবর্তী গিনি ও গিনি-বিসাউ থেকে শুরু করে পুবে সীমান্তবর্তী মালি, নাইজার, শাদ ও সুদান হয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত পুরো অঞ্চল সেনা-শাসিত।
মহাদেশটির সেনা-অভ্যুত্থান হওয়া দেশগুলোকে আলাদা করে দেখলে এর পুব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে একটি বেল্টের মতো দেখায়।
সংবাদ বিশ্লেষকদের কাছে এই সেনা-শাসিত দেশগুলো 'ক্যু-বেল্ট' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
'ক্যু-বেল্টে' বাঁধা গণতন্ত্র?
সংবাদ বিশ্লেষকরা আফ্রিকার সেনা-শাসিত সাহারা-সাহেল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিকে বোঝাতে 'ক্যু-বেল্ট' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করছেন। এই আলোচনায় বাংলায় 'কোমরবন্ধনী' অর্থে ইংরেজি 'বেল্ট' ব্যবহার করা হচ্ছে। কেননা, সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বলা যেতে পারে—সেনাদের 'বেল্টে' আজ বাঁধা পড়ছে দেশগুলোর গণতন্ত্র।
জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে আফ্রিকার সাম্প্রতিক সেনা-অভ্যুত্থানগুলোকে 'নতুন ধারা' বলে আখ্যা দিয়েছে।
আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মহাদেশটির এসব সেনা-অভ্যুত্থানকে আফ্রিকার 'ক্যু-ক্রাইসিস' হিসেবে অভিহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ডের ত্রৈমাসিক আফ্রিকা ডিফেন্স ফোরাম আরও একধাপ এগিয়ে বলছে—'মাদাগাস্কারের ঘটনা দেখিয়ে দিলো সেনা-অভ্যুত্থান আফ্রিকার নিজস্ব সমস্যা'।
সাময়িকীটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদাগাস্কার ও সাহেল অঞ্চলের সরকার পরিবর্তনের ঘটনাগুলোর মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেও আফ্রিকার একেক দেশে একেক কারণে সেনা-অভ্যুত্থান হয়েছে।
ডয়েচে ভেলের অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকার ৫৪টির মধ্যে ৪৫টি দেশে সেনা-অভ্যুত্থান হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, আফ্রিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২টি সেনা-অভ্যুত্থান ও একটি ব্যর্থ সেনা-অভ্যুত্থান যুক্ত হয়েছে।
গত অক্টোবরে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ দেশ মাদাগাস্কারে কয়েক সপ্তাহের গণবিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে ক্ষমতা নেয় সেনাবাহিনী।
প্রায় ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৯৬ কিলোমিটারের এই দ্বীপ বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম। বাওবাব-খ্যাত এই দ্বীপটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপদেশও।
১৯৬০ সালের ২৬ জুন মাদাগাস্কার ফরাসিদের হাত থেকে স্বাধীনতা পায়। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য মতে—২০২৫ সালে মাদাগাস্কারের মাথাপিছু আয় ৬১৬ মার্কিন ডলার হতে পারে।
গত বছর নভেম্বরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউয়ে সেনারা রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কারচুপি হয়ে থাকতে পারে এমন অভিযোগে সেনারা রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
এই দুই সফল সেনা-অভ্যুত্থানের পর গত বছর ৭ ডিসেম্বর আটলান্টিক-ছোঁয়া মধ্য আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশ বেনিনে একদল সেনার শাসনক্ষমতা গ্রহণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সেদিন 'নতুন যুগের' ডাক দিয়ে সেনাদের একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবির পর সেই সেনাদের গ্রেপ্তারের সংবাদ আসে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী ও আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তায় সেই সেনা-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।
২০২০ সালের পর থেকে অর্থাৎ, গত ৫ বছরে আফ্রিকার ৯ দেশ সরাসরি সেনাশাসনে গিয়েছে। এসব দেশকে একসঙ্গে এখন 'ক্যু বেল্ট' বলা হচ্ছে। জনমানুষের মুক্তির কথা বলে সেনারা সেসব দেশের ক্ষমতা নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কোথাও দেখা গিয়েছে জনতার উচ্ছ্বাস। কোথাও উদ্বেগ।
আশাবাদী নাগরিকরা বলছেন—গণতন্ত্রের নামে দীর্ঘদিন ধরে চলা অগণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত অপশাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অসাম্য দূর হবে। তরুণদের কাজের সুযোগ হবে।
বিপরীত পক্ষ বলছে—দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষীণতম আলোটুকুও হারিয়ে গেল সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে। এক অগণতান্ত্রিক সরকারের পরিবর্তে আরেক অগণতান্ত্রিক সরকার শাসন ভার নিচ্ছে। এরপর একসময় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন। তারপর সেনাসমর্থিত সরকার। অর্থাৎ, সেনাদের 'বেল্টে' বাঁধা গণতন্ত্র।
গত বছর ২৭ নভেম্বর ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—'গত ৫ বছর আগে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেওয়া সেনা-শাসকরা এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে'।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিনা ইউলেন সংবাদমাধ্যমটিকে জানান—সব সেনা-শাসকই বেসামরিক সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার কথা বললেও বাস্তবতা হচ্ছে ৫ বছর আগে যেসব সেনাশাসক ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা এখনো দেশ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তার মতে, নতুন সেনা-শাসকরা বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তা কতটা রাখতে পারবেন এখনই বলা যাচ্ছে না।
এবার সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোয় সেনা-অভ্যুত্থান হওয়ায় ফ্রান্স ও এর মিত্র পশ্চিমের দেশগুলো সেসব দেশে নিষেধাজ্ঞা দিলেও সেনা-শাসিত দেশগুলো রাশিয়া ও চীন থেকে সহায়তা পাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভাগনার গ্রুপের কথাও উল্লেখ করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
এক নজরে ৯ দেশ
গত ৭ ডিসেম্বর আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়—২০২০ সাল থেকে আফ্রিকার দেশগুলো একে একে সেনা-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই ধারায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ বেনিন।
যদিও, সেখানে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলাসানে সেইদু।
তিনি এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, বেনিনের সশস্ত্র বাহিনী অভ্যুত্থানচেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছে। তিনি সবাইকে 'আগের মতো যার যার কাজে ফিরে যাওয়ার' অনুরোধ করেছেন।
একই প্রতিবেদনে জানানো হয়—২০২০ সালে পশ্চিম আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশ মালিতে বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে দেন সামরিক নেতা কর্নেল আসিমি গইতা। পরের বছর তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।
২০২১ সালে সেনা-কর্মকর্তা মাহামাত ইদ্রিস দেবে তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মধ্য আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের সাবেক ফরাসি উপনিবেশ শাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
সেই বছর পশ্চিম আফ্রিকার অপর সাবেক ফরাসি উপনিবেশ গিনির ১১ বছরের শাসককে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে দেশটির একদল সেনা সদস্য।
একই বছর পূর্ব আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের দেশ সুদানে সেনা-অভ্যুত্থান হয়।
২০২২ সালে পশ্চিম আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশ বুরকিনা ফাসোয় এক সেনা-শাসককে সরিয়ে সেনাদের আরেকটি দল ক্ষমতা নেয়।
২০২৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকার আরেক সাবেক ফরাসি উপনিবেশ নাইজারে রাষ্ট্রপতি মোহামেদ বাজুউমকে সরিয়ে ক্ষমতা নেয় সেনাবাহিনী।
সেই বছর মধ্য আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশ গ্যাবনে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপতি আলি বোঙ্গোকে নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণার পরপর সেনারা তাকে সরিয়ে দেয়।
২০২৫ সালে আফ্রিকায় আরও দুটি সেনা-অভ্যুত্থান সফল হয়। একটি মহাদেশটির দক্ষিণাঞ্চলে সাবেক ফরাসি উপনিবেশ মাদাগাস্কারে, অপরটি পশ্চিম আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশ গিনি-বিসাউয়ে।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরে ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—বেনিনে অভ্যুত্থানচেষ্টা প্রতিবেশী নাইজেরিয়ার ভঙ্গুর শাসনব্যস্থাকে সামনে তুলে ধরছে।
অর্থাৎ, মহাদেশটিতে সেনা-শাসিত দেশের তালিকা দীর্ঘ হওয়া আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
অভ্যুত্থানের 'নতুন ধারা'
গত বছর ১৫ ডিসেম্বর ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—'কিভাবে আফ্রিকা সেনা-অভ্যুত্থানের "নতুন ধারা" প্রতিরোধ করতে পারে'।
এতে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকা-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক জ্যাকি সিলিয়ার্স মনে করেন, পশ্চিম আফ্রিকা ও সাহেলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা একটি সংকট।
তার ভাষ্য, 'এসব অস্থিরতার কারণ—শিক্ষিত তরুণদের কাজের ব্যবস্থা নেই। কোনো সম্ভাবনাও নেই। তাই পরিস্থিতি এত উত্তপ্ত।'
মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় কার্নেগি মেলনের সহকারী অধ্যাপক জন জে চিন আফ্রিকায় ১৯৪৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হওয়া সেনা-অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি সেসব সেনা-অভ্যুত্থানের কারণ-ধরন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
তার গবেষণায় দেখা যায়—সারা পৃথিবীতে সেনা-অভ্যুত্থানের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। তাই আফ্রিকার সেনা-অভ্যুত্থানকে তিনি মহাদেশটির 'নিজস্ব সমস্যা' বলে মনে করেন।
বিশ্লেষকদের অনেকের মতে—সম্পদশালী আফ্রিকার দেশগুলোর 'ভাগ্য-উন্নয়ন' সব শাসকের লক্ষ্য থাকলেও দিনশেষে দেখা যায় শাসকরা নিজেদের ও তাদের ঘনিষ্ঠ অভিজাতদের ভাগ্য-উন্নয়ন আগে শুরু করেন। তাই, একই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সেখানে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হয়।
ছিনিয়ে নেওয়া ক্ষমতাকে যখন যে দেশ বৈধতা দেয় সামরিক শাসকরা তখন সেই দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
জন জে চিন আরও মনে করেন—আফ্রিকায় সেনা-অভ্যুত্থান 'ভাইরাসের মতো' ছড়িয়ে পড়ছে। কোন দেশের পর কোন দেশ আক্রান্ত হবে এখন এর পূর্বাভাস দেওয়া কাজ চলছে।



