এক কাপ চা—শুধু পানীয়, নাকি সুস্থতার সহজ পথ?

By রেহনুমা শাহরীন

এক কাপ চা কেবল উষ্ণ পানীয় নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে কথোপকথনের শুরু বা আড্ডার আসর জমিয়ে তুলতে চায়ের সঙ্গে অন্য কোনো পানীয়র তুলনাই হয় না। পড়াশোনার ফাঁকে, দীর্ঘ আলাপচারিতায়, পারিবারিক গেট-টুগেদার কিংবা হঠাৎ আসা অতিথি আপ্যায়নে—যেকোনো পরিস্থিতিতেই এক কাপ চা যেন আলাদা আমেজ যোগ করে। চা কখনো আলাপচারিতা শুরুর মাধ্যম হয়ে ওঠে তো কখনো আড্ডার মেলবন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মুখে কোনো কথা না বলে সামনে থাকা মানুষটির দিকে এক কাপ চা বাড়িয়ে দিন—দেখবেন, মুহূর্তেই পরিবেশটা হয়ে উঠবে আরও মনোমুগ্ধকর ও আপন।

চাকে বিশ্বের বহুল প্রচলিত জাতীয় পানীয় বলা যেতে পারে। রাজকীয় চায়ের পেয়ালা থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের ভাঙাচোরা কাপ—সবখানেই চায়ের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ চা পান করে। সবুজ, কালো, আংশিকভাবে অক্সিডাইজড কিংবা হারবাল—ভিন্ন সময় ও ভিন্ন প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ নানান ধরনের চা উপভোগ করে থাকে। প্রতিটি দেশেরই চা-পানের নিজস্ব স্বাদ, স্বকীয়তা ও আমেজ রয়েছে। ব্রিটিশদের কাছে চা মানে কথোপকথন আর বৃষ্টির আবহ, জাপানিদের কাছে তা শিষ্টাচার ও নীরবতার প্রতীক, আর বাঙালিদের জন্য ফুটন্ত গরম দুধে মশলা মেশানো ঘন দুধের চা যেন এক অনন্য ভালোবাসা।

চা সাধারণত ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস নামক গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। চা-পাতার রঙ কালো, সবুজ বা সাদা হবে—তা গাছের কোন পাতা তোলা হচ্ছে তার ওপর নয়, বরং পাতা সংগ্রহের পর কীভাবে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয় তার ওপর নির্ভর করে। কালো চা বা ব্ল্যাক টি সম্পূর্ণভাবে অক্সিডাইজড হওয়ায় এর স্বাদ কড়া, গন্ধ তীব্র এবং রঙ গাঢ় হয়। গ্রিন টিতে এই প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে পাতার সতেজতা বজায় থাকে এবং স্বাদে হালকা পাতার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। উলং চা আংশিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, আর হোয়াইট টির ক্ষেত্রে একেবারে কচি পাতা সংগ্রহ করা হয়, যেগুলো প্রায় প্রক্রিয়াজাতই করা হয় না—ফলে এর লিকার অত্যন্ত হালকা ও সূক্ষ্ম হয়।

চা পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নাকি ক্ষতিকর—এ নিয়ে শত শত গবেষণা করা হয়েছে। এর বেশিরভাগই পর্যবেক্ষণভিত্তিক হলেও, প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে চা পানের কিছু স্পষ্ট উপকারিতা চোখে পড়ে।

গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেচিন এবং ব্ল্যাক টিতে থাকা পলিফেনল, যেমন: কোয়ারসেটিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ফ্রি র‍্যাডিক্যালের কারণে কোষের যে ক্ষতি হয়, তা থেকে কোষকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।

ফ্রি র‍্যাডিক্যাল হলো এক ধরনের অস্থিতিশীল কণিকা, যা দুশ্চিন্তা, দূষণ ও হজমের গোলযোগের কারণে শরীরে জমতে থাকে। এসব কণিকার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তাই নিয়মিত চা পান শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের জোগান দিয়ে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মতো ক্রনিক রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

আরও বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত চা পান করেন তাদের অন্যদের তুলনায় উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। গ্রিন টি শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মেটাবলিজম প্রক্রিয়াকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ব্ল্যাক টি আমাদের অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী অণুজীবের (এটাকে এক ধরনের 'অদৃশ্য বাস্তুতন্ত্র' বলা যেতে পারে যা শরীরের অভ্যন্তরে হজম, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমনকি মানসিক স্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে) জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

চায়ের প্রভাব কেবল শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়, মস্তিষ্কের ওপরও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। চায়ের অন্যতম প্রধান উপাদান এল-থিয়েনিন তন্দ্রাভাব ছাড়াই এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। ক্যাফেইনের সঙ্গে যৌথভাবে এটি মানসিক চাপ কমায় এবং স্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে। এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাধু-সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে গণিতবিদদেরও নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে আছে গরম, ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা।

অত্যাধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এল-থিয়েনিন মস্তিষ্কের আলফা ব্রেইন ওয়েভ বাড়ায়, যার ফলে সৃজনশীলতা ও স্থির মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। কফি যেখানে স্নায়ুকে হঠাৎ উত্তেজিত করে তোলে, সেখানে চা পান মানসিক স্থিতি ও ভারসাম্য এনে দেয়—এই পার্থক্য থেকেই চা ও কফির ভিন্ন প্রভাব স্পষ্ট হয়। চা পান শরীরে এমন এক ধরনের শক্তি জোগায়, যা প্রশান্তিদায়ক।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, চা বানানোর পুরো প্রক্রিয়াটি—পানি ফুটে ওঠার অপেক্ষা, চা পাতা থেকে ধীরে ধীরে লিকারের রঙ ছড়িয়ে পড়া দেখা এবং চায়ের সুঘ্রাণে শ্বাস নেওয়া—ব্যস্ত দিনের মাঝেও মনে হালকা স্বস্তি এনে দেয়, যেন চরম ব্যস্ততা থেকে ক্ষণিকের অবকাশ পাওয়া যায়। আচরণগত স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই পুনরাবৃত্ত স্নায়বিক অভ্যাস শরীরে কর্টিসলের মাত্রা কমাতে এবং বিষণ্ণতা হ্রাসে সহায়ক। মনোবিদরা একে বলেন 'সেন্সরি রেগুলেশন'; আর আমরা সহজ করে বলি—'আহা, শান্তি'।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, সুস্থ থাকার জন্য নানা রকম পরিকল্পনা করে দামি ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিয়মিত চা পান করলে এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই হয়। চায়ের জন্য বিশেষ কোনো আয়োজন লাগে না—একটু সময়, একটু তাপ আর কয়েকটি পাতা, তাতেই চা তৈরি। চুমুক দিতেই শরীরের ভেতর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের শান্তি।

সম্ভবত এখানেই চায়ের আসল শক্তি। চা আপনাকে ঠিক করে দেয় না; বরং মনে করিয়ে দেয়, আপনি কখনোই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েননি—শুধু সাময়িকভাবে ক্লান্ত ছিলেন। আর কখনো কখনো আমাদের প্রয়োজন হয় কেবল নিজের সঙ্গে কিছু নিরিবিলি সময়, যার নীরব সঙ্গী হয়ে থাকে শান্ত মুহূর্ত আর এক কাপ চা।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী