কাজ ভালো করলেও কেন অনেকের পদোন্নতি হয় না?
সব অফিসে এমন মানুষ কম-বেশি দেখা যায়, যিনি নিজের কাজ খুব ভালো বোঝেন, সময়মতো দায়িত্ব শেষ করেন, ভুল কম করেন, সহকর্মীদেরও সাহায্য করেন। তবু বছর পেরিয়ে যায়, তার আর পদোন্নতি হয় না। অথচ একই অফিসেই দেখা যায়, তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কোনো সহকর্মী নতুন দায়িত্ব পাচ্ছেন, নেতৃত্বের সুযোগ পাচ্ছেন কিংবা পদোন্নতিও পেয়ে যাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজের মূল্য নেই। বাস্তবতা অবশ্য একটু জটিল। কারণ পদোন্নতি সাধারণত শুধু কাজ জানা বা ভালো কাজ করার ওপর নির্ভর করে না। একজন কর্মী বর্তমানে কী করছেন, তার পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে আরও বড় দায়িত্ব সামলাতে পারবেন কি না, সেটিও এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়।
ভালো কাজ আর নেতৃত্ব এক বিষয় নয়
কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মী থাকেন, যাদের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। কিন্তু পদোন্নতির সময় প্রতিষ্ঠান ভাবতে চেষ্টা করে, এই ব্যক্তি কি শুধু নিজের কাজ ভালো করেন, নাকি অন্যদের কাজও সমন্বয় করতে পারবেন? কারণ পদোন্নতি অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান কাজের পুরস্কারের চেয়ে ভবিষ্যতের দায়িত্বের জন্য প্রস্তুতির স্বীকৃতি। যার ফলে অনেকে কাজের জন্য প্রশংসিত হলেও বছরের পর বছর একই পদে থেকে যান।
কাজের ফলাফল সবাই দেখছে—ধরে নেবেন না
অনেকে বিশ্বাস করেন, ভালো কাজ করলে সেটি এমনিতেই সবার নজরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে একজন ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কাজ দেখেন। ফলে আপনার অবদান সবসময় তাদের চোখে পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো প্রকল্পে কী করেছেন, কী ফল এসেছে বা কী সমস্যা সমাধান করেছেন, সেগুলো পেশাদারভাবে তুলে ধরতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
শুধু নির্দেশনা অনুসরণ নয়, উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ
একজন কর্মীকে একটি দায়িত্ব দেওয়া হলো, তিনি সেটি সফলভাবে শেষ করলেন। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রায়ই খেয়াল করা হয়, কে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করেন, কে সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং কে সমাধানের প্রস্তাব দেন। কারণ নেতৃত্বের পদে সাধারণত শুধু কাজ সম্পন্ন করলেই হয় না, নতুন সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
যোগাযোগ দক্ষতার প্রভাব অনেক বড়
অফিসে এমন মানুষ পাওয়া যায়, যিনি কাজের বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ, কিন্তু মিটিংয়ে নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেন না। আবার এমনও কেউ থাকতে পারেন, যিনি জটিল বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দক্ষতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দায়িত্ব যত বাড়ে, মানুষের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনও তত বাড়ে।
শুধু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে
কিছু কর্মী মনে করেন, তাদের দায়িত্বের বাইরে কিছু করা প্রয়োজন নেই। এতে হয়তো কাজের চাপ কম থাকে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের চোখে তারা সীমিত পরিসরে কাজ করা মানুষ হিসেবেই থেকে যান। অন্যদিকে নতুন প্রকল্পে যুক্ত হওয়া, অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া বা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দেখানো মানুষদের নেতৃত্বের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হয়।
সুসম্পর্ক তৈরি আর তোষামোদ এক বিষয় নয়
অনেকে বস কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ রাখেন না। তাদের ধারণা, কর্মক্ষেত্রে বেশি মেলামেশা বা ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা মানেই তোষামোদ করা। কিন্তু দুটি বিষয় একেবারেই আলাদা। কর্মক্ষেত্রে সুসম্পর্ক তৈরি করা মানেই কারও মন জোগানো নয়। বরং এটি সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করার একটি অংশ। আপনি কীভাবে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেন, অন্য বিভাগের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বা সংকটের সময় সহযোগিতা করেন—এসব বিষয়ও আপনার পেশাগত ভাবমূর্তি তৈরি করে।
কখনো কখনো অতিরিক্ত নির্ভরযোগ্য হওয়াও বাধা হয়ে দাঁড়ায়
এটি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব এত ভালোভাবে পালন করেন যে তাকে সেই জায়গা থেকে সরাতে কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় পড়ে। কারণ তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফলে তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে যেতে পারেন।
নেতৃত্বের যোগ্যতা শুধু অভিজ্ঞতায় আসে না
অনেকেই মনে করেন, বেশি বছর কাজ করলেই পদোন্নতি পাওয়া উচিত। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব মানে শুধু অভিজ্ঞতা নয়। আপনি কি অন্যদের সাহায্য করেন? নতুন সহকর্মীদের কাজ শেখাতে পারেন? মতবিরোধ হলে সমাধানের চেষ্টা করেন? চাপের মধ্যেও পেশাদার আচরণ বজায় রাখেন? এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পদোন্নতি চান কি না, সবাই বুঝে নিতে পারে না
অনেক কর্মী মনে করেন, কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে যে তিনি পদোন্নতি চান। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়। আপনি যদি কখনো নতুন দায়িত্বের আগ্রহ না দেখান, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা না করেন বা নেতৃত্বের সুযোগ নিতে না চান, তাহলে প্রতিষ্ঠান ধরে নিতে পারে আপনি বর্তমান ভূমিকাতেই স্বচ্ছন্দ।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, পদোন্নতি না পাওয়ার পর শুধু হতাশ হয়ে বসে থাকা কিংবা কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করে সান্ত্বনা নেওয়ার চেয়ে নিজের কোনো ঘাটতি কাটাতে হবে কি না, সেটি বোঝা বেশি কার্যকর। কোন দক্ষতায় উন্নতি প্রয়োজন, কোন জায়গায় ঘাটতি আছে বা পরবর্তী ধাপে যেতে কী করতে হবে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে সামনে এগোনো সহজ হয়।
কাজ ভালো করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্মজীবনে পদোন্নতি শুধু দক্ষতার পুরস্কার নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দৃশ্যমান অবদান, নেতৃত্বের সম্ভাবনা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। তাই শুধু নিজের কাজ ভালোভাবে করার পাশাপাশি, নিজের প্রভাব ও সম্ভাবনাকেও তুলে ধরতে জানতে হয়।