৫ বৈশিষ্ট্যের মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচে, জানাল গবেষণা

রবিউল কমল
রবিউল কমল

দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কার না কাম্য! তাই কেউ স্বাস্থ্যকর খাবার খান, কেউ নিয়মিত ব্যায়াম করেন, আবার কেউ মানসিক চাপ কমানোর নানা উপায় খোঁজেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, দীর্ঘায়ুর একটি বড় রহস্য লুকিয়ে আছে আপনার ব্যক্তিত্বের মধ্যেই!

শুনতে অবাক লাগলেও কয়েক দশকের গবেষণা বলছে, মানুষের কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য কেবল তার সামাজিক সম্পর্ক বা কর্মজীবনেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না, বরং দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, এসব বৈশিষ্ট্যের কিছু অংশ জিনগতভাবে আমাদের মধ্যে থাকলেও জীবনযাপন ও অভ্যাসের মাধ্যমেও অনেকটাই গড়ে ওঠে।

মজার বিষয় হলো, আমরা নিজেদের সম্পর্কে যা ভাবি, তার চেয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অনেক সময় আমাদের ব্যক্তিত্বকে আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। অর্থাৎ আপনি কেমন মানুষ, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর কাছেই আছে।

A Year of Kids Playing Pandemic | The Local
দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে দায়িত্বশীলতার। ছবি: সংগৃহীত

দায়িত্বশীল মানুষ কেন বেশি দিন বাঁচেন

দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে দায়িত্বশীলতার।

প্রায় ৭৫ বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় মাঝবয়সী ৩০০ দম্পতির জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। অংশগ্রহণকারীদের বন্ধুদের দিয়ে তাদের ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করানো হয়েছিল। দেখা যায়, যেসব পুরুষকে তাদের বন্ধুরা দায়িত্বশীল, নিয়মানুবর্তী, সতর্ক এবং কাজের ক্ষেত্রে যত্নবান হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি দিন বেঁচেছিলেন।

এর কারণও খুব স্বাভাবিক। দায়িত্বশীল মানুষ সাধারণত অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি কম নেন, নিয়ম মেনে চলেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন। এসব অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একই ধরনের ফল পাওয়া যায় ২০০৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পরিচালিত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত যারা দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের গড় আয়ু তুলনামূলকভাবে বেশি।

Unlocking the Power of Healthy Longevity: Demographic Change,  Non-communicable Diseases, and Human Capital
 নতুন কিছু শেখার আগ্রহ মস্তিষ্ককে সচল রাখে, সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং মানসিক স্থবিরতা কমাতে সাহায্য করে। ফলে বার্ধক্যেও মস্তিষ্ক তুলনামূলক সক্রিয় থাকে। ছবি: সংগৃহীত

নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা

কেবল নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট নয়, নতুন কিছু শেখার আগ্রহের দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।

একই ৭৫ বছরের গবেষণায় মুক্ত মানসিকতাকে দীর্ঘায়ুর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা নতুন ধারণা, ভিন্ন মতামত, নতুন অভিজ্ঞতা কিংবা অন্যের অনুভূতিকে গ্রহণ করতে আগ্রহী, তাদের দীর্ঘ জীবন পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ মস্তিষ্ককে সচল রাখে, সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং মানসিক স্থবিরতা কমাতে সাহায্য করে। ফলে বার্ধক্যেও মস্তিষ্ক তুলনামূলক সক্রিয় থাকে।

মানসিক স্থিতিই বড় শক্তি

পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে গবেষণার ফল একেবারে একই ছিল না। নারীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক পাওয়া গেছে মানসিক স্থিতিশীলতার।

জীবনে দুশ্চিন্তা, হতাশা কিংবা চাপ আসবেই। কিন্তু যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, অযথা উদ্বেগে ভেঙে পড়েন না এবং বাস্তবতাকে শান্তভাবে গ্রহণ করেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলক ভালো থাকে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রাসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই মানসিক স্থিতি কেবল ভালো থাকার জন্য নয়, দীর্ঘ জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Longevity Quotes: Wisdom to Inspire a Century
মানসিক স্থিতি কেবল ভালো থাকার জন্য নয়, দীর্ঘ জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষদের এগিয়ে রাখছে গবেষণা

সব সময় হাসিমুখে কথা বলা, অন্যকে সাহায্য করা কিংবা সহজেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভ্যাস, এসবেরও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।

ওই গবেষণায় নারীদের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ দীর্ঘ জীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে এসেছে।

এই ফলকে আরও শক্তিশালী করেছে ৯৫ থেকে ১০০ বছর বয়সী ২৪৩ জন প্রবীণকে নিয়ে পরিচালিত আরেকটি গবেষণা। সেখানে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন সহজ-সরল, হাসিখুশি, সামাজিক এবং বহির্মুখী স্বভাবের মানুষ। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতার মাত্রাও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

A Year of Kids Playing Pandemic | The Local
সব সময় হাসিমুখে কথা বলা, অন্যকে সাহায্য করা কিংবা সহজেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভ্যাস, এসবেরও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।  ছবি: সংগৃহীত

অনুভূতি চেপে রাখবেন না

অনেকেই নিজের কষ্ট, রাগ বা আনন্দ প্রকাশ না করে সবকিছু নিজের ভেতরেই জমিয়ে রাখেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, খোলামেলা আবেগ প্রকাশের সঙ্গেও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।

৯৫ থেকে ১০০ বছর বয়সী মানুষের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, তারা কেবল সামাজিকই ছিলেন না; তারা প্রায়ই হাসতেন, নিজেদের অনুভূতি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন এবং আবেগ প্রকাশে সংকোচ করতেন না।

তবে গবেষকেরা এও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, এসব ব্যক্তিত্ব তাদের দীর্ঘ জীবন দিয়েছে, নাকি দীর্ঘ জীবন যাপনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা এমন ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। কারণ গবেষণাটি এমন মানুষের ওপর করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যেই শতবর্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

Long-Life Learning and the Age-Integration of Higher Education
গবেষণা বলছে, খোলামেলা আবেগ প্রকাশের সঙ্গেও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। ছবি: সংগৃহতি

ব্যক্তিত্ব কী বদলানো সম্ভব

ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য জন্মগত হলেও এর অনেকটাই গড়ে ওঠে পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষা ও অভ্যাসের মাধ্যমে।
নিয়মিত জীবনযাপন, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, মানুষের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা ও দায়িত্বশীল আচরণ চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের অনেক দিকই ধীরে ধীরে উন্নত করা সম্ভব।

দীর্ঘ জীবন কেবল পুষ্টিকর খাবার, ব্যায়াম কিংবা ভালো চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে না। আমরা কীভাবে জীবনকে দেখি, অন্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করি, কতটা ইতিবাচকভাবে নতুনকে গ্রহণ করি কিংবা প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত কীভাবে নিই—এসবও আমাদের সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

(নোট: দীর্ঘায়ু ও ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে আলোচিত এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে মনোবিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স-এ। ‘Your Friends Know How Long You Will Live: A 75-Year Study of Peer-Rated Personality Traits’ শীর্ষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের মনোবিজ্ঞানী জোশুয়া জে. জ্যাকসন ও তার সহকর্মীরা। গবেষণায় ৬০০ অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং তাদের বন্ধুদের দেওয়া ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নের সঙ্গে তাদের দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা।)