শীতে পোষা প্রাণীর যত্ন নেবেন যেভাবে

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

শীতে হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়া, শুষ্ক বাতাস ও শৈত্যপ্রবাহ মানুষের পাশাপাশি প্রাণীদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। এসময় কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন পোষা প্রাণীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল কেয়ার সেন্টারের সিনিয়র সহকারী ভেটেরিনারিয়ান নুসরাত জাহান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শীতের সময় কুকুর-বিড়াল-পাখিসহ যেকোনো পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে, সেটা হচ্ছে ওদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, আচরণ, খাওয়া-দাওয়া ও মলমূত্র। এ বিষয়গুলো ঠিক আছে কি না সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'যদি দেখেন যে ওরা ঠিকমতো খাচ্ছে না, বসে বসে ঝিমাচ্ছে, চোখ বা নাক দিয়ে পানি পড়ছে কিংবা পাতলা পায়খানা হচ্ছে, তাহলে বুঝবেন আপনার পোষা কুকুর বা বিড়ালটি অসুস্থ।'

pets_1.jpg

যেসব রোগ হতে পারে

নুসরাত জাহান বলেন, 'শীতে সাধারণত ভাইরাসজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয় পোষা প্রাণীরা। সেইসঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দেয়।'

তার মতে, কুকুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্যানাইন ডিসটেম্পার, ক্যানাইন পারভো, কেনেল কফ, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা ও আর্থ্রাইটিস। বিশেষ করে বাচ্চা ও বয়স্ক কুকুরদের এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিড়ালের ক্ষেত্রে হারপিস ভাইরাস ও ক্যালিসি ভাইরাসের সংক্রামণ হতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগে বিড়ালরা। ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হলে খাবারে অরুচি, বমি, ডায়রিয়া ও রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়।

নুসরাত জাহান বলেন, 'এক্ষেত্রে খুব দ্রুত বিড়ালকে চিকিৎসা না করালে তা মরণঘাতী হতে পারে।'

পাখির ক্ষেত্রে সালমোনেলোসিস, নিউমোনিয়া, বার্ড ফ্লু, এভিন কনজাংটিভাইটিস বা চোখের সংক্রমণ খুবই উল্লেখযোগ্য অসুখ।

ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল বেশি হলে পাখির শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান নুসরাত জাহান।

এ ছাড়া অতিরিক্ত ঠান্ডায় শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে হাইপোথারমিয়ার মতো প্রাণঘাতী অসুখে আক্রান্ত হতে পারে যেকোনো পোষা প্রাণী।

চর্মরোগ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা

নুসরাত জাহান বলেন, 'শীতে বাতাস শুষ্ক থাকার কারণে প্রাণীদের ত্বকও রুক্ষ হয়ে যায়। চুলকানি, খুশকি বা লোম ঝরে পড়ার মতো সমস্যায় ভোগে বিড়াল-কুকুর উভয়ই।'

ইদানীং কুকুর-বিড়ালদের ক্ষেত্রে দাউদ বা রিংওয়ার্ম খুব প্রকট আকার নিয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বলেন, 'ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও এখন রিংওয়ার্ম বা দাউদ অনেক বেড়ে গেছে।'

এটি মূলত ছত্রাকের সংক্রমণ বলে উল্লেখ করে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার ও প্রয়োজনে লাইম সালফার দিয়ে কুকুর-বিড়ালকে গোসল করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

নুসরাত জাহানের মতে, পোষা বিড়াল-কুকুরের জন্য ত্বকের আরেকটি অসুখ ইদানীং খুব মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সেটি হলো লাইম ডিজিস বা টিক প্যারালাইসিস।

ফ্লি ও টিক বা ছোট উকুনের মতো এক ধরনের পরজীবীর সংক্রমণে এ রোগে আক্রান্ত হয় কুকুর-বিড়ালরা। এটি প্রাণীদের ত্বকে জন্ম নেয় এবং রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে।

এর কারণে প্রথমে চুলকানি হলেও ধীরে ধীরে লোম ঝড়ে পড়া, ত্বকের প্রদাহ, অ্যালার্জি, আঁচড়ানোর কারণে ক্ষতসহ রক্তশূন্যতা পর্যন্ত হতে পারে।

আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে সাধারণত গরমের সময়ে এটা বেশি দেখা গেলেও এখন শীতকালেও এ রোগ অনেক বেড়ে গেছে বলে জানান ভেটেরিনারিয়ান নুসরাত জাহান।

তার মতে, শীতকালে পোষা প্রাণীর সামান্য উপসর্গকেও অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করলে জীবনঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

যত্ন নেবেন যেভাবে

চিকিৎসক নুসরাত জাহান বলেন, 'শীতকালে কুকুর, বিড়াল বা পাখিকে বারান্দায় বা খোলা জায়গায় একদমই রাখা যাবে না। অবশ্যই ওদের ঘুমানোর বা থাকার জায়গা উষ্ণ হতে হবে বা হিটারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।'

শীতে ঘন ঘন গোসল করানো ঠিক নয় উল্লেখ করে গোসল করালে কুসুম গরম পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

বলেন, 'শীতে শরীর গরম রাখতে প্রাণীদের একটু বেশি শক্তি দরকার হয়। তাই পুষ্টিকর খাবার দেওয়া জরুরি।'

পোষা পাখিদের ক্ষেত্রে খাওয়ার পানি দিনে অন্তত দুইবার পরিবর্তনের পাশাপাশি পানি একটু উষ্ণ গরম করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক নুসরাত।

মাঝে মাঝে পানির সঙ্গে অল্প পরিমাণে চিটাগুড়, ভিটামিন সি বা লেবুর রস মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি জানান।

বলেন, 'এটি শীতের সময় পাখিদের মানসিক চাপ কমানোসহ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।'

সবচেয়ে যা জরুরি

পশু চিকিৎসক নুসরাত জাহান বলেন, 'প্রাণীরা তাদের কষ্ট বা ব্যথা নীরবে সহ্য করে যায়, মানুষকে বোঝাতে পারে না। তাদের প্রতি অবহেলা করলে ছোট সমস্যা অল্প সময়ে অনেক বড় রোগে পরিণত হতে পারে।'

আদরের প্রিয় বিড়াল-কুকুর বা পাখিটিকে হারাতে না চাইলে শীত বা গরম নয়, সবসময়ই ওদের প্রতি খেয়াল রাখার পরামর্শ তার।

শুধু পোষা প্রাণী নয়, রাস্তাঘাটে থাকা কুকুর-বিড়ালদের প্রতিও মানুষের দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন ভেটেরিনারিয়ান নুসরাত জাহান।