পেঁয়াজুতে বিশ্বমঞ্চ জিতলেন বাংলাদেশি সাবিনা খান, আলো ছড়াচ্ছেন মাস্টারশেফ ইউকেতে
মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এর ২২তম আসর শুরু হয়েছে। শুরুতেই সবার নজর কাড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিযোগী সাবিনা খান। তিনি ইনস্টাগ্রাম পেজ ‘সাবিনা’স ফ্লেভার ল্যাবের’ উদ্যোক্তা। ঐতিহ্য, টেকসই ভাবনা ও সৃজনশীল রান্নার মিশেলে তার যাত্রা আলাদা করে চোখে পড়ছে।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সাবিনা খান এখন যুক্তরাজ্যে থাকেন। তার জীবনযাত্রার মতো রান্নাও বহুমাত্রিক। বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক রান্নার মঞ্চে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও স্বাদ তুলে ধরছেন।
তিনি নিজেকে ‘গ্লোবাল ফ্লেভার এক্সপ্লোরার’ বলেন। আর এই পরিচয় তার কাজের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই।
তিনি বলেন, ‘প্লেটে পরিবেশন করা খাবার এমন হতে হবে, যেন মানুষ স্বাদের ভেতরে ডুবে যেতে পারে।’ এতেই বোঝা যায়, খাবারের গভীর স্বাদকে তিনি ফিউশন বা বাহ্যিক নামের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তার কাছে রান্নার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
তিনি মনে করেন, বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবার এক প্লেটে একসঙ্গে থাকতে পারে। কারণ স্বাদ ও মানুষের সংযোগের বিষয় হলো খাবার।
বিভিন্ন দেশে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে তার এই খাদ্যযাত্রা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা, ভারতে পড়াশোনা, যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক সম্পন্ন করা এবং পরে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়া—এসব অভিজ্ঞতা তার রান্নাকে বৈচিত্র্যময় করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিভিন্ন সংস্কৃতির নানা ধরনের খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তার মায়ের রান্নাই তাকে প্রথম অনুপ্রাণিত করে এবং তার ভেতরে কৌতূহল তৈরি করে।
এই কৌতূহল থেকেই ‘সাবিনা’স ফ্লেভার ল্যাবের’ যাত্রা শুরু। রান্নাঘর ছাপিয়ে তিনি এটিকে সৃজনশীল ও পরীক্ষার জায়গা হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, ‘এটাকে ল্যাব বলি কারণ এখানে আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি। কখনো ভুল করি, তারপর আবার শুরু করি এবং নতুন করে রেসিপি তৈরি করি।’ তার কাছে রান্না মানেই শেখার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। এখানে নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
টেকসই জীবনযাপন তার ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি একজন পরিবেশ পরামর্শক। তাই তিনি মনে করেন, তার এই দৃষ্টিভঙ্গি রান্নাতেও থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে টেকসই ভাবনা সবসময়ই ছিল।’ তিনি ভর্তার উদাহরণ দেন। ‘ভর্তা মূলত অবশিষ্ট খাবার থেকে তৈরি হয়েছে। আমরা সবসময় চেষ্টা করতাম ঘরে যা আছে, তা দিয়েই রান্না করতে।’
এই চিন্তাধারা তার রান্নাঘরের অভ্যাসেও দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘আমি একটি মুরগি কিনলে এর প্রতিটি অংশই ব্যবহার করি।’
সাবিনা ব্যাখ্যা করে বলেন, তার রান্নাঘরে কিছুই ফেলা হয় না। মুরগির চামড়া থেকে শুরু করে হাড় দিয়ে স্টক তৈরি—সবকিছুই কাজে লাগে। এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। তিনি পরিবার থেকেই এই অভ্যাস শিখেছেন।
সাবিনা খানের মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এ অংশ নেওয়া তার জন্য এক ধরনের ফিরে আসা। এটি এমন এক স্বপ্ন, যা তিনি আগে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৬ বছর আগে তিনি এই প্রতিযোগিতায় আবেদন করেছিলেন। কিন্তু অন্তসত্ত্বা থাকায় তখন তাকে সরে দাঁড়াতে হয়।
এ বছর এই আয়োজনে অংশ নিতে তাকে উৎসাহ দেন তার সন্তানরাই।
তিনি বলেন, যখন আয়োজনে ডাক পাই, তখন মনে হয়েছিল যেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই আমাকে সেখানে যাওয়ার আহ্বান করছেন। তিনি এটিকে জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে দেখেন।
প্রথম পর্বে তিনি তৈরি করেন ডাল ও পেঁয়াজ দিয়ে ভাজা বাংলাদেশের একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় খাবার ‘পেঁয়াজু’।
তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশরা পেঁয়াজ ভাজি বা ডাল বড়া খেয়েছে, কিন্তু এই দুটি একসঙ্গে একটি খাবারে কখনো খায়নি।’
সাবিনা আরও বলেন, বিচারক গ্রেস ডেন্ট ও আনা হাফ তার পেঁয়াজু খেয়ে অবাক হয়ে যান এবং খুব প্রশংসা করেন। এমনকি একজন বিচারক এটিকে ‘আনন্দের বুলেট’ নাম দিতে চান।
এই খাবারের মাধ্যমেই তিনি প্রতিযোগিতার পরবর্তী ধাপে উঠে যান এবং শীর্ষ প্রতিযোগীদের মধ্যে জায়গা করে নেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি আরও সৃজনশীল একটি খাবার উপস্থাপন করেন, যার নাম ‘হারমনি সালাদ’। এতে ছিল ফালাফেল, কালা চানা, কোয়েল ডিম, পিকলড বিটরুট, সরিষার তেলের ড্রেসিং এবং ফরাসি পদ্ধতিতে তৈরি রসুন। আর পাশে ছিল মুড়ি। এই খাবারের মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন—কীভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ এক প্লেটে একসঙ্গে আসতে পারে।
প্রতিযোগিতায় চাপ অনেক বেশি হলেও সাবিনা এই অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।
তিনি বলেন, নিজেকে নতুন কিছু করতে বাধ্য করলে অনেক কিছু শেখা যায়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘৫০ বছর বয়সে আমি নতুন পেশা বেছে নিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছি।’
তার লক্ষ্য শুধু এই প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ‘ফ্লেভার ল্যাব’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি রান্নার বইও লিখতে চান। পাশাপাশি একটি রান্নাভিত্তিক সিরিজ তৈরি করতে চান এবং খাবারের ইতিহাস নিয়েও লিখতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমি চাই না এটি শুধু একটি বাংলাদেশি রান্নার বই হোক। এটি এমন একটি বই হবে যেখানে বিশ্বের নানা স্বাদ পাওয়া যাবে।’
তিনি বিশেষভাবে বাংলাদেশি নারীদের কথা বলেন, যারা ভালো রান্না জানেন কিন্তু সেই প্রতিভা ব্যবহার করতে পারেন না।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক নারী অসাধারণ রান্না জানেন। কিন্তু সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তারা আয় করেন না। তারা কেন পেশাদার শেফ হওয়ার চেষ্টা করবেন না বা নিজের ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করবেন না?’
আগামী সপ্তাহগুলোতে মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এর এই আসর এগিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সাবিনা খানের এই যাত্রা শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি তার পরিচয়, স্মৃতি, টেকসই ভাবনা ও স্বাদের গল্প।