সংস্কৃতি নদীর মতো, একে আপন গতিতে বইতে দিতে হয়: জেমস
নিজের জন্মদিন কখনো ঘটা করে উদযাপন করেন না তিনি। ভক্ত ও অনুরাগীরাই মূলত নানা আয়োজন করেন। এবারের জন্মদিনের আগের সময়টাও পূর্বাচলের একটি ক্লাবে কাটিয়েছেন। সেখানেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন ‘নগর বাউল’-খ্যাত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস।
ব্যান্ডের গান, সংগীতের পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রয়াত সহশিল্পীদের স্মৃতিচারণ ও জীবনবোধ—এক বিকেলে তার সঙ্গে কত বিষয়েই না কথা হলো।
আশির দশকের তরুণ জেমস আর ২০২৬ সালের জেমসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন কি না, এমন প্রশ্নে হেসে বললেন, ‘আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। শুধু মাথায় আগের চেয়ে চুল কিছুটা কমে গেছে—এ ছাড়া আর কিছু না।’
বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে পূর্বাচলের ওই ক্লাবে পৌঁছান ‘গুরু’। চোখে কালো সানগ্লাস, পরনে হালকা কালো টি-শার্ট ও জলপাই রঙের ট্রাউজার। হাসিমুখে সবার সঙ্গে হাত মেলালেন, পরিচিত হলেন। এরপর ছবি তোলার পালা।
ছবি তোলার একপর্যায়ে হঠাৎ সবাইকে থামতে বললেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের কেউ কেউ একটু চমকে গেলেও পরক্ষণেই বোঝা গেল, অন্য কিছু নয়—গোঁফটা পাকিয়ে নিতে চান তিনি। গোঁফ ঠিক করে জানতে চাইলেন, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’ পরে চেয়ার টেনে বসে ছবি তোলার সময় মজা করে বললেন, ‘এই চেহারা নিয়ে এর চেয়ে আর ভালো ছবি হবে না।’
এরইমধ্যে একটি কেক নিয়ে হাজির হলেন কেউ। আগাম জন্মদিন উদযাপনের আয়োজনে যোগ দিয়ে জেমস বসলেন সবার সঙ্গে। শুরু হলো প্রশ্নোত্তর। একের পর এক প্রশ্ন, আর সাবলীল ভঙ্গিতে সেগুলোর উত্তর দিয়ে চললেন তিনি। কোথাও বিরক্তি নেই, বরং কথার ফাঁকে ফাঁকে হাস্যরস।
অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা জেমস। কীভাবে এত গান তৈরি করলেন—এমন প্রশ্নে জানালেন, এর পেছনে সব সময় পরিকল্পনা বা হিসাব-নিকাশ কাজ করে না।
‘অত ভেবেচিন্তে বা পরিকল্পনা করে হয়নি। গান তৈরির একটা হিট অব দ্য মোমেন্ট আছে। ন্যাচারালি চলে আসে, আর গান তৈরি হয়ে যায়। জোরাজুরি করে সৃষ্টিশীল কিছু হয় না,’ বলেন তিনি।
গানের সংগীতায়োজন নিয়েও খুব জটিলভাবে ভাবেন না জেমস। প্রথমে একটি গানের মৌলিক কাঠামো তৈরি করেন, পরে ধীরে ধীরে সেটি পূর্ণতা পায়।
তার ভাষায়, ‘একটা গানকে সলিড বা টাইট কিছু হিসেবে না রেখে ফ্রেমটিকে লুজ রাখার চেষ্টা করি, যেন মূলভাব ঠিক রেখে প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যায়।’
জেমস জানান, তার গানগুলো কখনো সুরের ওপর কথা বসিয়ে, আবার কখনো কথার ওপর সুর বসিয়ে তৈরি হয়েছে। তবে কথা ও সুর একইসঙ্গে চলে আসে—এমন গানই তার বেশি পছন্দের।
‘বাচ্চু ভাইয়ের ওপর ভীষণ রাগ হয়’
কথা বলতে বলতে উঠে এলো প্রয়াত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ। তার কথা স্মরণ করতে গিয়ে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেমস।
‘এবির সঙ্গে কাটানো সময়গুলোকে খুব মিস করি। তার সঙ্গে আলাপ শুরু হওয়া মানেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাবে। তিনি খুবই আড্ডাবাজ ও মজার মানুষ ছিলেন।’
জেমস জানান, চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের পথচলা ও দুজনের মধ্যকার রসায়ন ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘এই লোকটাকে আমি সবসময় মিস করি। কোনো কারণ ছাড়াই হুট করে এভাবে চলে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে বাচ্চু ভাইয়ের ওপর ভীষণ রাগও হয়,’ বলেন জেমস।
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে টেলিফোনে শেষ কথোপকথনের প্রসঙ্গও উঠেছিল। তবে সেই আলাপের বিস্তারিত আর প্রকাশ করলেন না তিনি। মনে হলো, স্মৃতিটুকু একান্ত নিজের কাছেই রাখতে চান।
স্মরণ করলেন কবি শামসুর রাহমানকেও। কবির লেখা ‘উত্তর’ কবিতা থেকে গাওয়া ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ গানটি তার বেশ প্রিয়। জেমস জানান, শামসুর রাহমান তার জন্য আরও কয়েকটি গান লিখে দিয়েছিলেন। তবে সেগুলো আর সুর করা বা রেকর্ডিংয়ের পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রয়াত গিটারিস্ট নিলয় দাশ ও সংগীত পরিচালক লাকী আখান্দের কথাও মনে পড়ল তার। আশির দশকের সংগীতচর্চার পরিবেশ নিয়ে বলতে গিয়ে জেমস তুলে ধরলেন সেই সময়ের স্টুডিও সংস্কৃতির কথা।
‘সেসময় মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে স্টুডিওতে নিয়মিত দেখা হতো। স্টুডিওতে রিলাক্স পরিবেশে মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে আড্ডা-গল্প ও মিউজিকের নানা দিক নিয়ে ভাবনা আদান-প্রদানের একটা আলাদা গুরুত্ব ছিল,’ বলেন জেমস।
একজনের রেকর্ডিংয়ের সময় অন্যজন স্টুডিওতে উপস্থিত থাকতেন। জেমসের রেকর্ডিংয়ে আসতেন আইয়ুব বাচ্চু, আবার বাচ্চুর রেকর্ডিংয়ের সময় যেতেন জেমস। পরস্পরের কাজ দেখা, আড্ডা দেওয়া ও সংগীত নিয়ে ভাবনা বিনিময়ের সেই পরিবেশ এখন অনেকটাই বদলে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
‘বর্তমানে সেই স্টুডিও কালচার উঠে গেছে। সবাই ল্যাপটপ নিয়ে হোম স্টুডিও তৈরি করে নিজেদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে,’ বলেন এই শিল্পী।
‘লাভের চিন্তা থেকে মিউজিক করা যাবে না’
বর্তমান সংগীতশিল্প এবং নতুন প্রজন্মের সংগীতচর্চা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জেমসের কথায় উঠে আসে প্রযুক্তির পরিবর্তনের বিষয়টি। তার মতে, সময়ের সঙ্গে এই পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যেও শিল্পের টিকে থাকার ক্ষেত্রে মানুষের ভালোবাসা ও অনুরাগ গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষ্য, ‘এআই এখন নিজে থেকেই কোডিং করে ফেলছে, ফলে আলাদা করে কোডারদের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো আর্ট হারিয়ে যেতে বসলেও তা অনেক সময় টিকে যায় ভালোবাসা ও প্যাশনের কারণে।’
সংগীত এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজলভ্য। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে শ্রোতারা সহজেই পুরোনো ও নতুন গান শুনতে পারছেন। জেমসের মতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া গানগুলোই আগামী ২০ বছর মানুষকে গান শোনার সুযোগ করে দিতে পারে, নতুন গান তৈরি না হলেও।
তবে সহজলভ্যতার এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন তিনি। তার পর্যবেক্ষণ, সহজে পাওয়া যায় বলে অনেক সময় কোনো কিছুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে যায়। এখন অনেকে পুরো গানও শোনেন না।
এ পরিস্থিতিতে সংগীতচর্চার মূল প্রেরণা হিসেবে ভালোবাসা ও প্যাশনের ওপর জোর দেন জেমস।
‘যা কিছু করতে হবে, কেবল প্যাশন ও ভালোবাসা থেকেই করতে হবে। কোনো লাভের চিন্তা থেকে মিউজিক করা যাবে না। কিছু যদি নিজ থেকেই এসে যায় তো ভালো, কিন্তু লাভের আশা করলে হতাশ হতে হবে,’ বলেন তিনি।
নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের কাজের প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে তার। তরুণদের মেধা ও সংগীতের প্রতি আগ্রহের কথা উল্লেখ করে জেমস বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সুন্দর সংগীত তৈরি করতে পারলে তা গ্রহণে আপত্তির কিছু নেই।’
‘এখন এআইয়ের যুগ। তরুণ মিউজিশিয়ানরা যদি সুন্দরভাবে কাজ তৈরি করতে এআই বা নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারে, তবে অবশ্যই তাদের সেটা করা উচিত। নতুন যেকোনো ভালো প্রযুক্তি গ্রহণ করায় কোনো ভুল নেই,’ বলেন তিনি।
সংগীতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জেমসের বক্তব্য আরও স্পষ্ট। তার মতে, গান মানুষের শোনা ও গাওয়ার জন্যই। মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন জায়গায় গান গাইবে—এতে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
‘সংস্কৃতি নদীর মতো—একে আপন গতিতে বইতে দিতে হয়,’ বলেন তিনি।
‘টেক ইট ইজি’
জীবনকে কীভাবে দেখেন? গুরুর সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘টেক ইট ইজি’। অর্থাৎ, জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার পক্ষপাতী তিনি।
একজন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে তার বক্তব্য, সমাজের অসংগতি নিয়ে কেউ কথা বলতে চাইলে বলতে পারেন। তবে সেটি নির্ভর করবে তার নিজস্ব উপলব্ধি ও বোধের ওপর।
‘আমি একজন ইন্টারটেইনার, মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি,’ বলেন জেমস।
সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্যও তার পরামর্শ, সবাইকে একসঙ্গে ভালো করার বিশাল লক্ষ্য নিয়ে ভাবার চেয়ে প্রত্যেকে নিজের এবং নিজের আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করতে পারেন। তাতে স্বাভাবিকভাবেই সমাজেরও উপকার হবে বলে মনে করেন তিনি।
জীবনে কী পেয়েছেন, কী পাননি—সেসব নিয়েও কোনো হিসাব-নিকাশ করেন না জেমস। তার ভাষায়, জীবনটা তার কাছে পুরোটাই আনন্দের। অপ্রাপ্তি নিয়ে কখনো ভাবেননি, কোনো আক্ষেপও পুষে রাখেননি।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিসর ছাড়িয়ে কখনো কখনো জেমস নিজেই হয়ে ওঠেন বড় এক পরিচয়। এই জনপ্রিয়তা ও প্রত্যাশা কোনো চাপ তৈরি করে কি না, এমন প্রশ্নে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘এই চাপের কারণেই তো আপাতত গানবাজনা করছি না। চাপমুক্ত হলে আবার নতুন গান নিয়ে ভাবব।’
নতুন গান নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই
নতুন গান নিয়ে আপাতত কোনো তাড়াহুড়া না থাকলেও সংগীতচর্চা থেমে নেই। জেমস জানান, এখনো সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন স্টুডিওতে নিয়মিত অনুশীলন করেন। গাড়িতে যাতায়াতের সময়ও গান শোনেন।
প্রায় ২০ মিনিট ধরে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয় পাশের কক্ষে। সবাই সেখানে বসেছেন কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখছিলেন জেমস। নাশতা শেষে সবাইকে নিয়ে কেক কাটলেন। মুখে হাসি, কথায় রসিকতা—পুরো সময়জুড়েই ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন ‘নগর বাউল’। একে একে সবাই তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন। গাড়িতে ওঠার আগে সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘ভালো থাকিস।’