বৃষ্টিতে ভেজার এই উপকারিতাগুলো জানেন?
বাইরে ঝুম বৃষ্টি। সংসারের কাজ আর অফিসের দায়িত্বের ভিড়ে এক পশলা বৃষ্টির আওয়াজ যেন মুহূর্তেই আনমনা করে তোলে। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগগুলো হুট করেই আড়মোড়া ভেঙে স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। ছোট থেকে বড়, সবার মনেই বৃষ্টিতে একটুখানি ভেজার বাসনা উঁকিঝুঁকি দেয়।
বৃষ্টিতে ভিজলে যে শুধু মন ভালো হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়; এর রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ কিছু উপকারিতা। বৃষ্টিতে ভেজার উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সীফাত জাহান শশী।
তিনি বলেন, বৃ্ষ্টিতে ভেজার বেশকিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে। তবে, এক্ষেত্রে সতর্কও থাকতে হবে। কেউ কেউ বৃষ্টিতে ভিজলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে হালকা ভিজলেও ঠান্ডা লেগে যায়। তাদের সতর্ক থাকতে হবে। আবার যাদের সমস্যা হয় না, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ভেজার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
বৃষ্টিতে ভেজার স্বাস্থ্য উপকারিতা
বিশুদ্ধ বাতাস
বৃষ্টি হলে বাতাসে থাকা বিভিন্ন দূষিত পদার্থ ধুয়ে গিয়ে বায়ু পরিশুদ্ধ হতে সাহায্য করে। বায়ুদূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষতিকর কণার পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এমনকি ঝড়ো বৃষ্টিও বাতাসকে পরিশুদ্ধ করতে ভূমিকা রাখে।
এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষতিকর কণাগুলো’ আসলে কী? এগুলো শুধু গ্যাসীয় পদার্থ নয়; বরং বিভিন্ন ধরনের অতি সূক্ষ্ম কঠিন ও তরল কণাও এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন: ধোঁয়া, ধুলা, মাটির কণা, কীটনাশকের কণা এবং সমুদ্রের পানিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা এসব ক্ষুদ্র কণাকে সঙ্গে নিয়ে মাটিতে মিশে যায়। এভাবেই বৃষ্টি বাতাসকে আরও বিশুদ্ধ করে তোলে এবং আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই বৃষ্টিতে ভিজলে বুক ভরে সতেজ বাতাস গ্রহণ করা যায়, যা শরীর ও মন উভয়কেই প্রশান্ত করে।
মানসিক চাপ কমায়
‘সোঁদা মাটির গন্ধ’ চেনেন নিশ্চয়ই? ওই যে বৃষ্টি এলেই মাটির একটা সুন্দর গন্ধ এসে নাকে লাগে। বৃষ্টি শুকনো মাটিতে পড়লে মাটির যে গন্ধ নাকে ভেসে আসে তাকে পেট্রিকোর বলে। মাটিতে উপস্থিত স্ট্রেপ্টোমাইসিস নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া জিওসমিন নামক এক ধরনের পদার্থ তৈরি করে, যা থেকে মাটির এই সুন্দর গন্ধ সৃষ্টি হয়। কোথাও খুব সামান্য পরিমাণেও যদি জিওসমিন উপস্থিত থাকে, তবে মানুষ সেই ঘ্রাণ অনুভব করতে পারে।
আপনি জেনে অবাক হবেন যে, কিছু কিছু পারফিউমেও জিওসমিন ব্যবহার করা হয়। এবার এর উপকারিতা নিয়ে কিছু কৌতূহল নিশ্চয় মনে জাগছে! জিওসমিন মানুষের মনকে প্রশান্ত করে এবং মানসিক চাপ কমায়। শুধু তাই নয়, ব্রেইন ফাংশনকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। তাই বৃষ্টিতে আপনি যখন খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত দিগন্তের বুকে হেঁটে বা বসে থেকে সময় কাটাবেন, দেখবেন মনের মধ্যে একটা ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছে। দুশ্চিন্তাগুলোও যেন কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে আসে।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
বৃষ্টিতে সবুজের মাঝে সময় কাটানোর রয়েছে চমকপ্রদ এক স্বাস্থ্যসুবিধা। গাছ ফাইটোনসাইড নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আপনি যখন সবুজের মাঝে হারিয়ে যাবেন, এই প্রাকৃতিক উপাদান আপনার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে তুলবে। কারণ, ফাইটোনসাইড আমাদের দেহের রক্তে ন্যাচারাল কিলার (এনকে) সেলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
অধিক ক্যালোরি খরচ
আমরা যখন বৃষ্টিতে হেঁটে চলি, তখন কিছুটা দ্রুত পদক্ষেপে হাঁটি। ফলে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্যালোরি খরচ হয়।
ভালো লাগার অনুভূতি
বৃষ্টিতে ভেজার সময় আমরা সতেজ বাতাস উপভোগ করি, ভেজা মাটির গন্ধ নিই এবং প্রকৃতিকে অনুভব করি। আর এর সবই আমাদের সুখানুভূতি দেয় এবং মনকে শীতল করে তোলে। শুধু তাই নয়, এর ফলে আমাদের শরীরে এন্ডোরফিন নামক এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
নেগেটিভ আয়নযুক্ত সতেজ বাতাস
বৃষ্টির ফলে এক ধরনের নেগেটিভ আয়নের সৃষ্টি হয়। মূলত এটি বাতাসে উপস্থিত খুবই ক্ষুদ্র এক ধরনের কণিকা। বৃষ্টিতে ভেজার ফলে আমরা এই নেগেটিভ আয়নের সংস্পর্শে আসি, যা আমাদের মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্ক আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে এবং ক্লান্তি কমে যেতে পারে।
তবে আর দেরি কেন, এই ঝুম বৃষ্টিতে বৃষ্টি বিলাস করা যাক।