‘প্রাণতুচ্ছ’ সময়ে ‘যে দেশে মানুষ বড়’

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

ঈদ কিংবা জাতীয় উৎসব এলেই রাজধানী থেকে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে কোটি মানুষ। এটি কেবল যাত্রা নয়, শেকড়ে ফেরার এক গভীর মানসিক আকাঙ্ক্ষা।

সেই শেকড়ের কবি জসীম উদ্‌দীন বাংলার মাটি ও মানুষের অমলিন কণ্ঠস্বর। তার সাহিত্যকর্মে গ্রাম-বাংলার ধুলোবালি, মানুষের সরল আবেগ ও জীবনসংগ্রামের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বাংলা সাহিত্যে একক ও অনন্য।

তিনি শুধু একজন কবি নন, বাঙালির লোকজ জীবনবোধের ধারক ও বাহক।

জসীম উদ্‌দীন মূলত মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন পুনর্গঠনের প্রয়াসী এক সাহিত্যিক। লোকজ সংস্কৃতি ও আধুনিকতার যে সুতো ছিঁড়ে গিয়েছিল, তিনি সেই সুতোকে আবার জোড়া লাগাতে চেয়েছেন।

বাংলা কাব্যকে তিনি গণমানুষের ভাষা ও অভিজ্ঞতায় ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিলেন। তার রচনায় স্থান পেয়েছে সেইসব মানুষের জীবন, যাদের কথা তথাকথিত ভদ্র বা আধুনিক সাহিত্যে খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে।

পাশ্চাত্য-প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্য যে ‘উপর থেকে নিচে’ দেখার প্রবণতায় অভ্যস্ত, সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন বলেই তার সাহিত্য ‘নিচ থেকে উপরে’ ওঠা জীবনের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

জসীম উদ্‌দীনের জন্মশতবর্ষ পেরিয়েছে বহু আগে, মৃত্যুরও অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত। তবু তার প্রভাব অম্লান। তার বহুলপঠিত ‘কবর’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন সাম্প্রতিক সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এমন প্রভাবসঞ্চারী ঘটনা খুব বেশি নেই, যা শতবর্ষ পেরিয়েও সমানভাবে আলোচিত থাকে। জসীম উদ্‌দীন সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একটি, যিনি সময়কে অতিক্রম করে পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যে গীতিকবিতার ধারা নতুন নয়। বিহারীলাল চক্রবর্তী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত এই ধারার বিকাশ ঘটেছে নানা মাত্রায়। বিশ্বসাহিত্যের পরিমণ্ডলেও আমরা স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, জন কিটস কিংবা আলেকজান্ডার পুশকিনের মতো কবিদের দেখি, যারা লোকজ জীবন ও আবেগকে কাব্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯২৮ সালে প্রকাশিত জসীম উদ্‌দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’ নতুন মাত্রা যোগ করে। সেখানে গ্রামীণ জীবন কেবল বিষয় নয়, বরং কাব্যের আত্মা হয়ে ওঠে। তার লেখায় শহুরে দূরত্ব নেই; আছে মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের অনিবার্য সংযোগ।

কেবল লেখার শক্তির কারণে সারাজীবন দীনেশচন্দ্র সেনের মতো অনেকেই কবিকে কাছে নিয়েছেন, দিয়েছেন ভালোবাসা। প্রসঙ্গত তাই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—

সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি
সেই ঘর মরি খুঁজিয়া।
দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি
সেই দেশ লব যুঝিরা।
পরবাসী আমি যে দুয়ারে চাই—
তারি মাঝে মোর আছে যেন ঠাঁই,
কোথা দিয়া সেথা প্রবেশিতে পাই
সন্ধান লব বুঝিয়া।
ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়,
তারে আমি ফিরি খুঁজিয়া।

খ.

বাংলা সাহিত্যে জসীম উদ্‌দীনকে ‘পল্লীকবি’ বলা হলেও, এই উপাধি তার বিস্তৃত সাহিত্যিক সত্তাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। তিনি প্রকৃত অর্থে আমাদের জাতীয় আত্মার কবি।

পল্লীর উপাদান অনেকেই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু জসীম উদ্‌দীন সেই উপাদানকে জীবনের গভীর সত্যে রূপ দিয়েছেন। প্রথাগত আধুনিকতার গণ্ডি ভেঙে নতুন আঙ্গিক, ভাষা ও বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাকে উত্তরাধুনিক কবি বলাই শ্রেয়।

কবির বন্ধু পাক-রুশ মৈত্রী সমিতির সভাপতি গঙ্কোওস্কি তাকে সোভিয়েত রাশিয়ায় বেড়াতে যাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন। কবি সেখানে দলবলে যেতে আগ্রহী হননি। কারণ, তাতে মনমতো ঘোরা যায় না। তাই তিনি একাই গিয়েছিলেন।

১৯৬৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন ‘যে দেশে মানুষ বড়’। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। এটি তিনি উৎসর্গ করেন কমরেড মণি সিংহকে।

কবি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের অভিজ্ঞতা (মস্কো, লেনিনগ্রাদ, তাসখন্দ) তুলে ধরেছেন। এতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রতি তার একধরনের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

এটি নিছক ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়; বরং একটি গভীর মানবিক ও দার্শনিক অন্বেষণ। ভ্রমণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি যে সমাজচিত্র তুলে ধরেছেন, তা কেবল স্থান-কালনির্ভর নয়, বরং মূল্যবোধের প্রশ্নে এক মৌলিক অনুসন্ধান। যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে যেখানে মানুষের জীবন অনিশ্চয়তায় ভরা, সেখানে তিনি খুঁজে ফিরেছেন মানবতার চিহ্ন। তার উপলব্ধি হলো, যে সমাজে মানুষ বড়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য।

বইটির ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও হৃদয়গ্রাহী। জসীম উদ্‌দীনের স্বভাবসুলভ গদ্যে এমন এক আন্তরিকতা আছে, যা পাঠককে অনায়াসে আকৃষ্ট করে। কোথাও কোনো অলংকারের বাড়াবাড়ি নেই, বরং সরলতার মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে গভীর জীবনবোধ। ভ্রমণের পথে তিনি যেসব মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাদের জীবনসংগ্রাম, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা সবকিছুকেই সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখেছেন। ফলে পাঠকের মনে হয়, তিনিও যেন সেই যাত্রার অংশ।

আজকের বাস্তবতায় বইটির গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের সমাজে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ক্ষমতার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রায়ই মানুষের মৌলিক মর্যাদাকে আড়াল করে দেয়। নাগরিকরা অনেক সময় পরিণত হয় কেবল পরিসংখ্যানে। এই প্রেক্ষাপটে ‘যে দেশে মানুষ বড়’ এক শক্তিশালী মানবিক উচ্চারণ, যেখানে বলা হয়, মানুষের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অন্তর্নিহিত সামাজিক সমালোচনা। জসীম উদ্‌দীন সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দিলেও তার পর্যবেক্ষণ আমাদের সমাজের অসংগতিগুলোকে স্পষ্ট করে তোলে।

তিনি দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষকে সম্মান করা হয়, সেখানে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যেখানে মানুষ অবহেলিত, সেখানে উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক প্রদর্শনী হয়ে থাকে।

এই ভ্রমণগদ্যে প্রকৃতির বর্ণনাও অনন্য। নদী, মাঠ, গ্রাম সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে তার লেখায়। তবে এই প্রকৃতিচিত্র নিছক সৌন্দর্যের নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয়েই তিনি তার সাহিত্যজগৎ নির্মাণ করেছেন। ফলে এই বই আমাদের শুধু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দেয় না, দেয় এক সমগ্র জীবনদর্শনের স্পর্শ।

সোভিয়েতের সমাজ, রাষ্ট্র, সমাজতন্ত্র ও বিপ্লব যেমন আছে, তেমনই আছে শিশুদের প্রতি কবির মমতা, রুশ শিল্পের বর্ণনা, এমনকি সোভিয়েত নারীদের প্রতি মুগ্ধতার বয়ান। কবি রুশ নারীদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ এবং অবলীলায় সেটা স্বীকার করেছেন।

তবে ভ্রমণকালে তার যত নারীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ও উল্লেখযোগ্য সাতলানা নামে এক তরুণী। সাতলানা ‘ফুলের চেয়েও কোমল’। এই তরুণী সম্পর্কে পড়তে পড়তে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, তিনি কি সেই তরুণীর প্রেমে পড়েছিলেন? অবশ্য কবি সাতলানাকে তার ভালো লাগার কথা বলেননি, এমনটা ভাবলে ভুল হবে।

লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তিনি কোনো শ্রেণি বা অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করেন না। তার কাছে প্রত্যেক মানুষই গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বিভক্ত সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ‘যে দেশে মানুষ বড়’ আমাদের শেখায়, মানুষকে ভালোবাসা ও সম্মান করাই সভ্যতার মূল ভিত্তি।

কবির রুশদেশের বৈচিত্র্যময় স্থানগুলো ঘুরে দেখার মধ্যে অন্যতম শিশুকেন্দ্র, যেখানে তার ভাষায় ‘শিশুদের রাজত্ব’ রয়েছে। পাশাপাশি কবি মিউজিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা লিখেছেন এভাবে, ‘এখান হইতে ফিরিয়া যাইতে কেবলই মনে হইতেছিল, এই বিরাট পুরুষ, যার অঙ্গুলি হেলনে শত শত যুবক মৃত্যুকে অবহেলা করিত, কী সাধারণ, কী সহজ ছিল তাঁর স্বকীয় জীবনযাপন!’

মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ভ্লাদিমির লেনিনের প্রতিটি স্মৃতিই তাকে বিস্মিত করেছে। তার বিস্ময় ও অশেষ শ্রদ্ধা থেকেই তিনি লেনিনকে ‘মহামানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সর্বোপরি, বর্তমানে যখন উন্নয়নের নামে অনেক সময় মানুষের মৌলিক অধিকার উপেক্ষিত হয়, তখন জসীম উদ্‌দীনের এই বই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে মানুষ বড়? নাকি আমরা এখনো ক্ষমতা ও স্বার্থের বৃত্তে আবদ্ধ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই ‘যে দেশে মানুষ বড়’ পড়া জরুরি। এটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি এক মানবিক শিক্ষার উৎস। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি মানুষের মধ্যেই নিহিত। মানুষ যদি মর্যাদা পায়, তবেই একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে।

‘যে দেশে মানুষ বড়’ আজকের সময়ের জন্য এক অপরিহার্য পাঠ। এটি আমাদের মানবিক হতে শেখায়, সহমর্মী হতে শেখায় এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এই সহজ অথচ গভীর সত্যই বইটির স্থায়ী শক্তি। এ জন্যই এটি সময় অতিক্রম করেও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।