রঘু রাইয়ের মুক্তিযুদ্ধ যাত্রা
২৮ বছর বয়সী এক তরুণ। কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরা। দু’চোখে ছবির প্রতি অদম্য আকর্ষণ। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা তরুণটি সরকারি চাকরি ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন আলোকচিত্রের পথ। যার তোলা ছবিতে উঠে এসেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শরণার্থীদের অসহায়গ্রস্ত মুখ। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের দিকে ছুটে চলা শরণার্থীদের নির্মম যাতনা। এক কাপড়েই ভিটেমাটি ছাড়া মানুষের দেশত্যাগের কষ্টগাঁথা, স্বজন হারানো লাখো মানুষের বেদনার্ত মুখ, শরণার্থী শিশুর ক্ষুধার্ত কান্না, শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয়হীন মানুষের জীবনধারণের চেষ্টাসহ অসংখ্য আলোকচিত্র।
রঘু রাইয়ের ক্যামেরার লেন্স মুক্তিযুদ্ধে কোটি শরণার্থীর একক মুখচ্ছবিতে পরিণত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী ক্যাম্পের অসহায়ত্ব মানুষ ও প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করা মানুষের দুঃসহ অভিজ্ঞতা বারবার বিক্ষিপ্ত করে তুলেছিল রঘু রাইয়ের মনোজগৎকে। নিজের লেখা প্রামাণ্য চিত্রের বই ‘Bangladesh: The Price of Freedom’ এসব উল্লেখ কয়েছেন রঘু রায়।
তিনি লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ঢল বাড়ছে এবং তা একপর্যায়ে দেশত্যাগে রূপ নিচ্ছে, এমন খবর পাওয়ার পর আমি ব্যাগ গুছিয়ে সকালবেলায় দিল্লি থেকে বিমানে করে কলকাতায় পৌঁছাই। এরপর সোজা যশোর রোড ধরে বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে রওয়ানা হই।’
‘সময়টা ছিল আগস্ট মাস, বর্ষা তখন তুঙ্গে। গাঢ় ধূসর আকাশ আর সারাটা পথ ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল। তখন সীমান্ত শুধু অরক্ষিতই ছিল না, চারদিক থেকে যেন উপচে পড়ছিল। শরণার্থীদের ঢল নামছিল, তাদের সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু জিনিসপত্র। খুব কম শরণার্থীদের সঙ্গে গরুর গাড়ি ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে তারা তখন একদিকে যেমন ক্লান্ত, অন্যদিকে নিদারুণ কষ্টে জর্জরিত। কেউ কথা বলছিল না। চারদিকে এক ধরনের গভীর নিস্তব্ধতা। ওদের সাথে যা ঘটছে তা তো সবারই জানা। এটি ছিল এক জাতীয় ট্র্যাজেডি।’
‘হাজার হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন ছোট্ট গ্রাম বনগাঁও অপর্যাপ্ত ছিল। তাদের তখন শুধু খাবার বা কাপড় নয়, মাথার ওপর একটি ছাদেরও প্রয়োজন ছিল। যা তাদের নিরাপত্তা ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা দিতে পারে। অন্যদিকে ভারতও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। এর মধ্যে যেসব শরণার্থী সিমেন্টের পাইপেও আশ্রয় পেয়েছিল তারা ভাগ্যবান ছিল।’
“শরণার্থীদের মধ্যে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের জন্য এটি আরও দীর্ঘ মনে হয়েছে। কারণ তখনও শরণার্থী শিবিরগুলো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তাদের সামনে ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। মানসিক আঘাত ছিল অসহনীয়। এমন দুঃখ কষ্টে এক বৃদ্ধা নারী যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। খাবারের জন্য চিৎকাররত এক শিশুর চোখ ভরে আসছিল কান্নায়। কয়েকদিন পরে আমি আমার তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে এই ছবিগুলো দেখেছিলাম। ছেলের চোখে মুখে ছিল বেদনাময় অভিব্যক্তি। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন?’”
‘কিন্তু এটি ছিল কেবল শুরু। সোনার বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) মানুষের ওপর এক ভয়াবহ গণহত্যার সূচনাপর্ব ছিল এটি। যারা পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম ভাইদের থেকে হাজার মাইল দূরে বিচ্ছিন্ন ছিল।’
রঘু রায় আরও লিখেছেন, ‘হাজার হাজার নারী পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। অসংখ্য শিশু এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেই বড় হয়েছিল। একটি গোটা প্রজন্মের অস্তিত্ব যেন নির্মমতায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। পাকিস্তানি সেনারা ধর্ষণের শিকার তরুণীদের বাঙ্কারে আটকে রেখে তাদের জন্য কাজ করতে ও রান্না করতে বাধ্য করেছিল। এই তরুণীরা এতোটাই হতবিহবল ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে, তারা আর সীমান্তের দিকে এগোতে পারছিল না। তবুও তাদের একজনকে ভীত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় নিজের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখতে দেখলাম।’
রঘু রাই জন্মেছিলেন ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের জং গ্রামে। দেশভাগের ফলে গ্রামটি পাকিস্তান অংশে পড়েছিল। চার বছর বয়সে শরণার্থী হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিল রঘু রাইকে। একাত্তরের শরণার্থীদের সঙ্গে নিজের চার বছর বয়সের দেশত্যাগের স্মৃতি মিলিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সবাই উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। প্রত্যেকে একে অপরের গল্প জানে। তাই এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। অদ্ভুত সেই বিপুল নীরবতা। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছে। লোকেরাও হেঁটে যাচ্ছে আর হেঁটে যাচ্ছে। দৃশ্যটা আমার চার বছর বয়সের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল। আমরা এসেছিলাম লাহোরের ১০০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের জং থেকে। শরণার্থীশিবিরের উদ্দেশে আমরাও অবিরাম হেঁটেছিলাম। ফলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের কষ্টের সঙ্গে আমি একাত্ম হয়ে পড়েছিলাম।’
দুঃসহ সেই অভিজ্ঞতার স্মরণ করতে গিয়ে রঘু রাই লিখেছেন, ‘পরদিন আমরা অন্য একটা এলাকায় গেলাম। উদ্বাস্তুরা সেখানে স্কুল সহ নানা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল। যেখানেই খালি জায়গা, সেখানেই ঠাঁই গড়ার চেষ্টা করছিল তারা। কেউ কেউ তো বড় সিমেন্টের পাইপের মধ্যেও আশ্রয় নিয়েছিল। রান্না চলত সেখানেই। কারণ, বর্ষা চলছে। শিশুদের মন খারাপ। তারা ক্ষুধার্ত। বাস্তবতা তারা বোঝে না। তারা ঠিকঠাক খাবার চাইছিল, কিন্তু কোথায়? আমি একটি শিশুর ছবি তুলেছিলাম। ওর চোখে পানি টলটল করছে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না। অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। এক বৃদ্ধাকে দেখলাম। একেবারে ক্লান্ত ও অবসন্ন। আমি তার সামনে বসলাম। তিনি মাথা তুলে যন্ত্রণাবিদ্ধ চোখে তাকালেন। তারপর অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। আমার প্রশ্ন করার সাধ্য ছিল না। এরপর আমি ত্রিপুরায় চলে গেলাম। বিভিন্ন সময়ে যেতে লাগলাম বিভিন্ন এলাকায়। ছবি তুলতে থাকলাম শরণার্থীদের। অকল্পনীয় এক অভিজ্ঞতা।’
রঘু রাইয়ের তোলা মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ ছবিতে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি অনেক বেশি লক্ষ করা যায়। কেন তার যুদ্ধের ছবিতে বারবার নারী এবং শিশুরাই সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছিল এমন প্রশ্নের জবাবে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। তারা সবকিছু সামলে রাখতে চায়। আর শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়, কারণ তারা কোমল ও অসহায়। পুরুষরাও অবশ্যই বিপর্যস্ত হয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবে নারীদের যন্ত্রণা আমার মধ্যে বেশি আবেগ আর কষ্ট জাগিয়েছিল।’
মুক্তিযুদ্ধে তোলা ছবির কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন রঘু রাই। কিন্তু তার তোলা সেই ছবিগুলোই একপর্যায়ে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যদিও তা ভাগ্যক্রমে ফিরে পান তিনি। একাত্তরে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় কর্মরত থাকা রঘু রায় ১৯৭৭ সালে সে পত্রিকা ছেড়ে সাপ্তাহিক সানডে পত্রিকায় যোগ দেন। নতুন পত্রিকায় যাওয়ার সময় তিনি সঙ্গে করে তোলা ছবির নেগেটিভগুলোও নিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর অফিস অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করার সময় মুক্তিযুদ্ধের ছবির নেগেটিভগুলো হারিয়ে ফেলেন। ফলে রঘু রাইয়ের কাজ কেবল স্টেটসমেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত স্বল্প সংখ্যক ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তার কাজ যে কতোটা বিস্তৃত ছিল তা আবিষ্কার হয়েছিল দীর্ঘদিন পর। পরে ৩৫ বছরের বেশি সময় সেই নেগেটিভগুলো কোনো খোঁজ পাননি রঘু রাই। কালের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যায় এক অনন্য অধ্যায়ের।
পরবর্তীতে নিজের তোলা সব ছবিকে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরের সময় নেগেটিভগুলো ভাগ্যক্রমে খুঁজে পেয়েছিলেন রঘু রাই। শেষমেশ আলোর মুখ দেখে মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের প্রতীকী হয়ে ওঠা ছবিগুলো।
মুক্তিযুদ্ধে রঘু রাইয়ের তোলা ছবি কতোটা আলোড়ন তুলেছিল তা একটি ঘটনার মাধ্যমে জানা যায়। ১৯৭২ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে প্রদর্শিত হয়েছিল রঘু রাইয়ের তোলা ছবির এক প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনীতে তার তোলা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কারতিয়ের-ব্রেসোঁ। যা তাকে বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল।
সেই স্মৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রঘু রাই বলেছিলেন, ‘সেদিন প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টায়। পৌনে ছয়টার দিকে আমি সেখানে গিয়ে দেখি একজন লাইকা ক্যামেরা হাতে নিয়ে প্রতিটি ছবি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। আমি তাকে দেখে মনে করলাম, এটা নিশ্চয়ই ব্রেসোঁ হবেন। আমি কিছুক্ষণ লক্ষ করলাম, তারপর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, হ্যাঁ তিনি সত্যিই ব্রেসোঁ। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমিই এইগুলোর ফটোগ্রাফার কিনা। তিনি যখন শুনলেন আমিই ফটোগ্রাফার, তখন তিনি বললেন, ‘আমাকে আগে ছবিগুলো দেখতে দাও, তারপর তোমার কাছে আসছি।’ তিনি ছবিগুলো দেখে বললেন, ‘খুব ভালো।’ তারপর তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করে বললেন, তিনি একজন খুব ভালো ভারতীয় ফটোগ্রাফারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে চান। তারপর আমি তাদের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ পাই। এটি ছিল অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা।’
রঘু রাই আরও বলেন, ‘ভারতে ফিরে আসার পর আমি প্যারিস থেকে ম্যাগনাম ফটোজের নামে একটি চিঠি পাই, যেখানে লেখা ছিল যে মি. ব্রেসোঁ আমাকে ম্যাগনামের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অবিস্মরণীয় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন রঘু রাই।
