ছাত্র হত্যার খবরে পতাকা অর্ধনমিত করেছিল ফরিদপুরের মাদ্রাসাছাত্ররা
(ভাষা আন্দোলনে ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ফরিদপুরের চরআত্রা আজিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় হরতাল পালন, শোক মিছিল এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করেছিল। ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে দ্য ডেইলি স্টারের ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে আজ থাকছে ফরিদপুর জেলার ভাষা আন্দোলনের চিত্র। ২০২৩ সালের এই প্রতিবেদনটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।)
ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনের গণজোয়ার ছড়িয়ে পড়েছিল ১৯৪৮ সালের মার্চেই, যা ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নাকচ হওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ক্লাস বর্জন, ধর্মঘট এবং ছাত্র-বুদ্ধিজীবী সমাবেশের মাধ্যমে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যা ১১ মার্চ ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সেই বিক্ষোভের ঢেউ লাগে ফরিদপুর জেলা শহরেও। ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থল ছিল রাজেন্দ্র কলেজ এবং স্কুলগুলো। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই ফরিদপুরে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্ররা মিছিল ও পথসভার মাধ্যমে আন্দোলন সফল করার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
ফরিদপুরে এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন রাজেন্দ্র কলেজের জ্যেষ্ঠ ছাত্রনেতা সৈয়দ মাহবুব আলী। তার সঙ্গে ছিলেন মহীউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মতিন, মোশাররফ আলী, আবদুল বারী, আবদুল হালিম, আদিল উদ্দিন হাওলাদার, লিয়াকত আলী ও মোল্লা জালাল উদ্দিন।
১১ মার্চ ফরিদপুরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফল ধর্মঘট পালিত হয়। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে সৈয়দ মাহবুব আলীসহ অন্য ছাত্রনেতাদের তৎপরতায় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিল যখন শহর প্রদক্ষিণ করছিল, তখন পুলিশ হামলা চালায় ও বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। এতে সৈয়দ মাহবুব আলী, মহিউদ্দিন আহমদ সূর্য মিয়াসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা আহত হন।
এরপর ফরিদপুরের মোট ১১ জন ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন আবদুল হালিম চৌধুরী (জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বাবা)। তার সহানুভূতিশীল ভূমিকার কারণে ছাত্রদের মুক্তি দেয় স্থানীয় প্রশাসন ও থানা।
পরবর্তী চার বছরে ভাষা আন্দোলনের গতিপথে পরিবর্তন আসে। ১৯৫২ সালে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে আসেন ইমামউদ্দিন আহমেদ, মনোয়ার হোসেন ও লিয়াকত হোসেন প্রমুখ। ইমামউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও মনোয়ার হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা ফরিদপুরের বিভিন্ন মহকুমা ও থানা পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা বৃহত্তর ফরিদপুরে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার খবর তড়িৎ গতিতে ফরিদপুরে পৌঁছায়। ছাত্র ও জনমানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম নেয় এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। কোতোয়ালি থানার সামনে পুলিশ ছাত্রদের মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন ছাত্রলীগের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রওশন জামাল খান।
২২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরে প্রথমবারের মতো পালিত হয় পূর্ণ দিবস হরতাল। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে চকবাজার মসজিদের দিকে রওনা দেয়। কোতোয়ালি থানার পুলিশ মিছিলে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। প্রতিবাদে ছাত্ররা থানার সামনে রাত ১২টা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট পালন করে। ১২টার দিকে পুলিশ গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিলে ছাত্রসমাজ ফিরে আসে।
২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ফরিদপুর কার্যত পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। সব প্রশাসনিক কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ফরিদপুর শহরের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মহকুমা শহর, মফস্বল থেকে গ্রামগঞ্জের হাটবাজারেও। ছাত্র হত্যার প্রতিক্রিয়ায় মিছিল ও প্রতিবাদে শামিল হয় স্কুল শিক্ষার্থীরাও।
২৩ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের চরআত্রা আজিজিয়া মাদ্রাসার (বর্তমানে শরীয়তপুর জেলা) শিক্ষার্থীদের হরতাল পালন, শোক মিছিল ও পতাকা অর্ধনমিত করার খবর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণস্থ শান্তিপূর্ণ সভায় কতিপয় ছাত্র হতাহত হওয়ার সংবাদে চরআত্রা আজিজিয়া জুনিয়ার হাই মাদ্রাসার ছাত্রগণ পূর্ণ হরতাল পালন করে। মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়। পরদিন ভোরে ছাত্রদের শোক মিছিল চার মাইল পথ প্রদক্ষিণ করে। অপরাহ্ণে ছাত্ররা মাদ্রাসার হেডমাস্টারের সভাপতিত্বে এক শোকসভায় সমবেত হয়।’
একই দিন আজাদ পত্রিকায় অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গতকল্য ৮ ঘটিকায় ছাত্রদের এক বিরাট শোভাযাত্রা বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করিয়া দাসের জঙ্গল ফুটবল মাঠে এক সভায় সমবেত হয়। মো. হোসেন আলী মিয়া সভাপতিত্ব করেন। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবি জানাইয়া প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।’
তথ্যসূত্র:
১. ভাষা আন্দোলন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া/ আহমদ রফিক
২. দৈনিক আজাদ, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২