‘আমার মেয়েটা কোথায়...ও তো একা খেতে পারে না’

‘রামিসার বিড়ালটাও ঠিকমতো খাচ্ছে না, একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে’
আব্দুল্লাহ আল আমীন
আব্দুল্লাহ আল আমীন
শাহীন মোল্লা
শাহীন মোল্লা

ঘটনার পর থেকেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা পারভিন বেগম। মাঝে মাঝে সংবিৎ ফিরে এলে বলছেন, ‘আমার রামিসা কোথায়? ওকে এনে দাও’। কখনোবা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা কই? ও স্কুলে যাবে, ভাত খাবে। ও তো একা খেতে পারে না...’

মায়ের এই আহাজারি শুনে মনে পড়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছিন্নমুকুল কবিতার সেই চরণগুলো,

বাড়ির মধ্যে সব-চেয়ে যে ছোটো
খাবার বেলা কেউ ডাকে না তাকে,
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিল,
তারই খাওয়া ঘুচেছে সব-আগে।

যে মেয়েটা একা খেতে পারে না বলে মায়ের দুশ্চিন্তা হচ্ছে, সেই মেয়েটাকেই কিছুক্ষণ পর রেখে আসা হবে কবরে। রামিসা আক্তারের মরদেহ নেওয়া হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে গ্রামের বাড়িতে। আজ বুধবার সেখানেই তার দাফন সম্পন্ন হবে।

রামিসা
জানাজার জন্য নেওয়া হচ্ছে রামিসার মরদেহ। ছবি: স্টার

রামিসা একটি বিড়াল আর কয়েকটি পাখি পুষতো। রামিসার বোন রাইসা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলছিল, ‘গতকাল থেকেই রামিসার বিড়ালটা ঠিকমতো খাচ্ছে না। একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে।’

‘রামিসা নিজের খাবার নিজে ঠিকমতো খেতে পারতো না। কিন্তু বিড়ালকে নিজের হাতেই খাইয়ে দিতো। বিড়ালটাকে খুব আদর-যত্ন করতো।’

মেয়ের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লাও। আজ বিকেল ৪টায় পল্লবীতে রামিসার জানাজায় উপস্থিত হওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা ছিল না তার।

সকালের দিকে আবদুল হান্নান হতাশার সুরেই বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই।’

নেহায়েত খারাপ বলেননি তিনি। এ জন্যই বলা হয়, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ (বিচার বাস্তবায়নে দেরি হওয়া আর বিচার না হওয়া একই কথা)। বছরের পর বছর বিচারকার্য ঝুলে থাকতে থাকতে একসময় সেটা আর দশটা ঘটনার আড়ালে চলে যায়, আর অপরাধীরাও আইনের কোনো না কোনো ফাঁক গলে বের হয়ে যায়।

রামিসা
ছবি: স্টার

এই কথাগুলোই বারবার উঠে আসছিল রামিসার বাসার সামনে তার হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে জমায়েত হওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কণ্ঠে।

সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রামিসার বাসার সামনে মানববন্ধন করেছে পল্লবীর পপুলার মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল রামিসা আক্তার। রোল নম্বর ছিল এক।

মানববন্ধন থেকে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ফুলের মতো মেয়েটাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, আমরা এর বিচার চাই।’

তিনি বলেন, ‘রামিসা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সবসময় পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তার হত্যাকারীর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

শুধু তার স্কুলের তরফেই নয়, আরও নানা ব্যানারে, নানা বয়স ও পেশার মানুষ ছুটে আসছেন পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে। তাদের সবার দাবি একটাই, রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি যেন দ্রুত নিশ্চিত করা হয়।

রামিসা
ছবি: স্টার

তাদেরই একজন সাইকা সাঈদ। পেশায় শিক্ষক ও দুই সন্তানের জননী সাইকা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা নিরাপদ পরিবেশ চাই। আমাদের প্রত্যেকের সন্তান যেন নিরাপদ থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় অবাধে মাদকসেবন চলে। মাদকমুক্ত না হলে এমন ঘটনাও চলতে থাকবে। আমরা আবাসিক এলাকার সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ চাই, যাতে রামিসার মায়ের মতো আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।’

তার দাবি, ‘উপযুক্ত শাস্তিই পারে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে। এই অপরাধী যদি শাস্তি না পায়, কিছুদিন পরেই জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসে, তাহলে সে আবার অপরাধে জড়াবে, অন্য কোনো মায়ের বুক খালি করবে।’

‘যার স্ত্রী এমন জঘন্য অপরাধে স্বামীকে সহযোগিতা করতে পারে, তাদের দ্বারা এমন আরও ঘটনা ঘটতে পারে। হয়তো আগেও অপরাধ করে তারা পার পেয়ে গেছে, আমাদের জানা নেই। কিন্তু, এমন একটা অপরাধের পর তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে’, যোগ করেন তিনি।

পঞ্চাশোর্ধ্ব রাশিদা বেগম বলেন, ‘এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘চেনা-জানা ছাড়া কাউকে হঠাৎ করে বাসা ভাড়া দিয়ে দেওয়া, কিংবা সাবলেট দিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থার কারণে এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে। কে, কীভাবে, কার ক্ষতি করবে সেটা বোঝার উপায় নেই। তাই নিরাপত্তার জন্য বাসা ভাড়া দেওয়ার আগে ভাড়াটিয়ার সম্পর্কে সব তথ্য জেনে নেওয়া আবশ্যিক করতে হবে।’

বিক্ষোভকারীদের সবারই অভিযোগ ছিল, বিচারহীনতার কারণেই অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, রামিসার হত্যাকারীর বিচার দ্রুত শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত না করলে কয়েকমাস পরেই হয়তো দেখা যাবে তারা জামিনে বের হয়ে গেছে এবং আবার অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে পল্লবী সেকশন-১১ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ও অজ্ঞাত আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।

রামিসা
অভিযুক্ত ধর্ষক ও হত্যাকারী সোহেল রানা এবং তার সহযোগী ও স্ত্রী স্বপ্না। ছবি: সংগৃহীত

এজাহারে বলা হয়, রামিসাকে নিজের বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করেন সোহেল। পরে তিনি শিশুটির গলা কেটে মরদেহ একাধিক টুকরো করেন। শিশুটির চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা দ্রুত ওই বাসার সামনে যান। কিন্তু এর আগেই সোহেল রামিসার মাথা কাটা মরদেহ বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখে। পরে টয়লেটের ভেতরে একটি বালতি থেকে তার মাথা উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে পুলিশ। সোহেল আত্মগোপনে চলে গেলেও সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আজ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে রামিসার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশ দুই আসামিকে আজ আদালতে হাজির করে। আদালত সূত্র জানায়, সোহেল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।