যারা জিন্নাহকে ‘কাফির-ই-আজম’ ডেকে হত্যাচেষ্টা করেছিল

আলতাফ পারভেজ
আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৪৭ এর ভারতভাগের প্রসঙ্গ বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। কয়েকটি বিশেষ ধারার দল এবং ছাত্র সংগঠনগুলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে হঠাৎ করে বাড়তি প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তর বা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বদলে সাতচল্লিশের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে নানান বয়ান হাজির করা হয়েছে।

এরকম শক্তিগুলো সাতচল্লিশ ও চব্বিশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর যৌথ কৃর্তৃত্বও দাবি করছে তরুণ সমাজের সামনে।

এই বাস্তবতায়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে ইসলামপন্থী দাবিদার দলগুলোর অবস্থান ও বক্তব্য খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন স্বনামধন্য গবেষক আলতাফ পারভেজ।  

ইতিমধ্যে আমরা এম এ জিন্নাহ, মাওলানা মওদূদী ও মাওলানা মাদানির মধ্যকার ত্রিমুখী বিতর্ক সম্পর্কে লিখেছি। তবে দেশভাগ কালে জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের সঙ্গে অন্যান্য অনেক মুসলমানপ্রধান দল ও ধর্মীয় পণ্ডিতেরও প্রতিকূল সম্পর্ক চলছিল।

সেসব নিয়ে আজ এই সিরিজের চতুর্থ লেখা।

পর্ব ১: জিন্নাহ বনাম মাদানি: পাকিস্তান নিয়ে ভুলে যাওয়া বিতর্ক

পর্ব ২: জিন্নাহ বনাম মওদূদী: পাকিস্তান নিয়ে ভুলে যাওয়া বিতর্ক

পর্ব ৩: মাদানি বনাম মওদূদী: পাকিস্তান নিয়ে ভুলে যাওয়া বিতর্ক

জিন্নাহকে যারা হত্যা করতে গিয়েছিল এবং ‘কাফির-ই-আজম’ বলতো

সাতচল্লিশের আগে পাকিস্তান আন্দোলনকালে অখণ্ড ভারতবর্ষজুড়ে ইসলামপন্থী দাবিদার দলের সংখ্যা ছিল অনেক। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা ছিল ‘খাকসার’ আন্দোলন এবং মজলিসে আহরার। লীগ ও জিন্নাহ এই দুই ধারা থেকে সবচেয়ে ক্রুদ্ধ আক্রমণের শিকার হচ্ছিলেন। এর মাঝে খাকসাররা জিন্নাহকে দুবার হত্যার চেষ্টা করে বলে লীগের তরফ থেকে অভিযোগ রয়েছে।

খাকসার আন্দোলনের প্রধান ছিলেন মাওলানা মাশরিকি (১৮৮৮-১৯৬৩), যিনি আল্লামা মাশরিকি নামেও পরিচিত ছিলেন। ‘খাকসার’ শব্দের ভাষাগত অর্থ হলো যারা ছাইভষ্মের মতো নিরীহ। কিন্তু সাংগঠনিক ধরনে খাকসাররা ছিল অনেকটা আধা-সামরিক বাহিনীর মতো। খাকি পোশাক করে, দলীয় প্রতীক বেলচা নিয়ে তারা রাস্তায় কুচকাওয়াজ করতো এবং সংঘাতপ্রিয় ছিল। অনেক সময় তারা ছদ্ম যুদ্ধমহড়াও আয়োজন করতো।

তবে সামরিক ধরনে সংগঠন গড়ার কাজে খাকসারই প্রথম বা একমাত্র সংগঠন নয়। একই ধরনের সাংগঠনিক রীতির চর্চায় ছিল সাভারক অনুসারী স্বয়ং রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (আরএসএস) কর্মীরাও। পরে লীগও ‘ন্যাশনাল গার্ড’ নামে ওরকম ধাঁচের সহযোগী সংগঠন গড়ে তোলে। শিখদেরও ‘আকাল ফৌজ’ নামে আধা-সামরিক সংগঠন ছিল।
 
মজলিশে আহরারের মতো খাকসারদেরও প্রধান সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল পাঞ্জাব। ১৯২৫ সালে ‘আল-তাজকিরাহ’ নামে একটি গ্রন্থের মাধ্যমে মাশরিকি তার চিন্তাভাবনা নিয়ে হাজির হন। এটা লেখার পরপর তিনি জার্মানি যান এবং সেখানে নাজি নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। ব্রিটিশরা এতে ক্ষুব্ধ ছিল।

ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসকদের বিরোধিতার ব্যাপারে খাকসাররা ছিল আপোষহীন ও কট্টর। সেই সূত্রে ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনের সময় খাকসাররা নির্মম নিপীড়নের শিকার হয়। পুলিশি বর্বরতায় এই দিনে এতো খাকসার কর্মী নিহত হয় যে, এটাকে তখন থেকে ‘খাকসার কারবালা’ বলা হতে থাকে।

ঘটনাটি ঘটে লীগের সম্মেলনস্থল মিন্টো পার্ক থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। পাঞ্জাবে এসময় প্রাদেশিক সরকার পরিচালনায় ছিল জিন্নাহ ও লীগের ঘনিষ্ঠ সিকান্দার হায়াত খান।

১৯৪০ এর সহিংসতার পর খাকসারদের এক দফা নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষিদ্ধে লীগের নীরব সমর্থন ছিল বলে মনে হয়েছে। মাশরিকি সম্পর্কে জিন্নাহর বিরূপ মনোভাব এবং ব্রিটিশরাজের কর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে তার ঐকমত্যের বিষয়ে অনেক সাক্ষ্য প্রমাণ মেলে।

লীগ খাকসারদেরকে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ মনে করতো। পাঞ্জাবে লীগের মিত্র সিকান্দার হায়াত খানও খাকসারদের ব্যাপারে রূঢ় মনোভাব পোষণ করতেন। ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চের ঘটনায় সেটা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়। এই দিনের ঘটনায় আহত হয়ে মাশরিকীর পুত্র এহসানুল্লাহ খানও পরে মারা যান।

পরে খাকসারদের নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে জিন্নাহ দুই ভাবে লাভবান হন। একদিকে খাকসাররা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। অন্যদিকে, খাকসার নিষিদ্ধের মাধ্যমে পাঞ্জাবে লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সিকান্দার হায়াত খানের জনপ্রিয়তাও কমে।

ব্রিটিশদের সঙ্গে জার্মানদের রেষারেষিও খাকসারদের নিয়ে তাদের স্পর্শকাতরতার একটা কারণ ছিল। জিন্নাহ এ বিষয়ে ব্রিটিশদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হননি। জিন্নাহ মুসলমান সমাজে লীগের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী দেখতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি খাকসারদের ‘মতাদর্শিকভাবে অন্ধ’ বলতেন।

এর মাঝেই ১৯৪৩ সালের ২৬ জুলাই বোম্বেতে নিজ বাড়িতে জিন্নাহকে ছুরি মারে একজন খাকসার। হামলাকারীর নাম ছিল রফিক সাবির। এই আক্রমণে জিন্নাহ শরীরের দুই জায়গায় ক্ষতসহ সামান্য আহত হয়েছিলেন।

এই ঘটনায় সেসময় মামলাও হয়। যেহেতু লীগের বাইরে ঘটনার নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না সে কারণে জিন্নাহ পরিবারের অভিযোগ নিয়ে কিছুটা সন্দেহও ছিল। আবার খাকসার দল আদালতে প্রমাণ করতে সমর্থ হয় যে, আক্রমণকারী তাদের কর্মী নয়।

১৯৪৩ সালের ২৬ জুলাই মাওলানা মাশরিকি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে দাবি করেন, তাদের দলের উপর ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চের বর্বরতা এবং ১৯৪৩-এর ২৬ জুলাই জিন্নাহর উপর কথিত এক খাকসারের হামলার দাবি আসলে ষড়যন্ত্র মাত্র। এই দুই ষড়যন্ত্রের একটা করেছে সরকার এবং অন্যটায় যুক্ত জিন্নাহ।

দেশভাগের ঠিক আগমুহূর্তে ১৯৪৭ সালের ৯ জুন দিল্লির ইমপেরিয়াল হোটেলে লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠককালে খাকসারদের সঙ্গে লীগের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এখানেই লীগ ভারত ভেঙ্গে ধর্মীয় বিবেচনাকে সামনে রেখে দুটি পৃথক দেশ তৈরির মাউন্টব্যাটন পরিকল্পনা অনুমোদন করে। খাকসাররা এই বৈঠকে এসে দেশীয় অস্ত্র হাতে লীগের এরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলা যেভাবে ভাগ হচ্ছিলো তাতে খাকসাররা সন্তুষ্ট ছিল না।

ইমপেরিয়াল হোটেলে বিক্ষোভকালে লিগের কর্মীরা (ন্যাশনাল গার্ড) এবং পুলিশ যৌথভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সেখান থেকে বের করে দেয়। এই হামলার কথা লীগ আগে থেকে জানতো বলে যথেষ্ট পরিমাণ ন্যাশনাল গার্ডকে মজুদ রেখেছিল। সংঘর্ষের সময় জিন্নাহকে শান্তভাবেই অবস্থান করতে দেখা যায়। তবে লীগ এটাকে খাকসারদের জিন্নাহকে ‘দ্বিতীয় হত্যাচেষ্টা’ হিসেবে প্রচার করে।

লীগের পাশাপাশি খাকসারদের সঙ্গে সংঘাত ছিল দেওবন্দি, বেরলভি এবং আহালে হাদিস ধারার সংগঠকদেরও। এসব মহল থেকে খাকসারদের রুখতে পাঞ্জাবে প্রথম গঠিত হয় আনসার-উল-মুসলিমিন সংগঠন। এটা গড়ে তোলে আহরাররা। পরে এটাকে অন্তর্ভুক্ত করে আরও বৃহত্তর একটা সংগঠন তৈরি হয় ‘ফৌজ-ই-মুহাম্মদি’ নামে। এতে দেওবন্দি, বেরলভি, জমিয়তে হিন্দ অনুসারী সবাই যুক্ত ছিল। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদেরই বলা হতো ‘রাজাকারান-ই-ইসলাম’। যে ‘রাজাকার’ শব্দটি একাত্তরে বাংলাদেশ যুদ্ধকালে পাকিস্তানজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

খাকসারদের পাশাপাশি পাঞ্জাবে লীগের আরেক বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ ছিল মজলিশে আহরার ও তার নেতা আতাউল্লাহ শাহ বুখারী।

আহরার অর্থ যারা মুক্ত। উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে তারা কংগ্রেসের মিত্র ছিল। শুরুর দিকে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন চৌধুরী আফজাল হক, হাবিবুর রহমান লুদিয়ানী, শাহ বুখারী, মাওলানা জাফর আলী খান প্রমুখ। তবে শিগগির বুখারীর নেতৃত্বই প্রধান হয়ে ওঠে।
 
শাহ বুখারীর জন্ম ১৮৯২ সালে পাটনায় হলেও বড় হয়েছেন পাঞ্জাবে। তিনি দেওবন্দের শিক্ষার্থী ছিলেন। জিন্নাহ ও লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের তীব্রতম এক সমালোচক বুখারী। কথা বলে দীর্ঘসময় শ্রোতাদের সম্মোহিত করে রাখতে পারতেন তিনি।

এই দলের সংগঠকরা লীগকে কখনোই মুসলমান সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি মনে করতো না। তাদের কাছে লীগ ছিল ‘ব্রিটিশদের প্রভাবিত’ সংগঠন—যাদের কাজ উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে মুসলমানদের সরানো।

আহরারের যুক্তি ছিল পাকিস্তান হলে এবং সেখানে ভারতের মুসলমানরা চলে গেল হিন্দু সমাজ হবে বিশাল এই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার। সম্রাট অশোকের পর ইতিহাসে প্রথম এরকম ঘটবে। এছাড়া বারো শত মাইল দূরে থাকা দুটি ভূখণ্ড নিয়ে কোন একক দেশ হতে পারে না।

এরকম একটা দেশ এবং তার নেতা হিসেবে জিন্নাহ আহরারের দ্বারা ব্যঙ্গবিদ্রূপের শিকার হতেন। পাকিস্তানকে তারা বলছিল ‘পলিদিস্তান’ (ময়লা জায়গা) এবং জিন্নাহর কায়েদ-ই-আজম উপাধিকে ব্যঙ্গ করে বলা হতো ‘কাফির-ই-আজম’।

জিন্নাহকে পশ্চিমা চালচলনের জন্য ‘ব্যাভিচারী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো। লীগের নেতাদের মধ্যে মক্তব-মাদ্রাসার বদলে স্কুল-কলেজে পড়ুয়াদের আধিক্য দেখিয়ে আহরার বলার চেষ্টা করত, এই নেতৃত্বের অধীনে ইসলামী রাষ্ট্র গড়া সম্ভব হবে না।

সাতচল্লিশের পর বুখারী নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের নিশ্চয়তা দেন। ফলে, লীগ নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে তাদের বিরোধিতাকারী ১৯টি সংগঠনের যে কালো তালিকা করে তা থেকে আহরার ছাড় পায়। ১৯৪৭ সালের পর এই দল লুদিয়ানা ও লাহোরভিত্তিক দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে আহমদীদের বিরোধিতায় নামে। যার সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক আছে বাংলাদেশেও।

অন্যদিকে, খাকসাররা সাংগঠনিকভাবে ১৯৪৭ এর পর বেশ দুর্বল হয়ে যায়। যদিও খাকসার তেহরিক পাকিস্তান নামে কিছু কিছু কাজ করে ঐ দলের পরবর্তী প্রজন্ম।