কক্সবাজার রুটে ট্রেনে এক বছরে ২৭ বার পাথর নিক্ষেপ, ঝুঁকিতে যাত্রীরা
কক্সবাজার থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেনে করে ঢাকায় ফিরছিলেন মোহাম্মদ হিমেল আহমেদ (২৫)। হঠাৎ বাইরে থেকে আসা একটি পাথর সজোরে আঘাত হানে তার মুখে। তার চারটি দাঁত ভেঙে যায়, কেটে যায় ঠোঁটের ভেতরের অংশ। সেদিন তার পাশে থাকা মোহাম্মদ আবু সাঈদ (৪০) নামের আরেক যাত্রীও ঘাড়ে আঘাত পান।
গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। রেলওয়ের নথিপত্র বলছে, সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ট্রেনটি কক্সবাজার স্টেশন ছেড়ে আসে। হিমেল ও সাঈদ বসেছিলেন নন-এসি ‘ঘ’ বগির ৩৫ ও ৩৬ নম্বর আসনে। চকরিয়া পার হওয়ার সময় বাইরে থেকে ট্রেনটিতে পাথর ছোড়া হয়।
ট্রেনে দায়িত্বরত এক অ্যাটেনডেন্ট জানান, সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু ঘটে যায়। তিনি বলেন, ‘পাথর সরাসরি ওই যাত্রীর মুখে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ঝরতে শুরু করে। আমরা ট্রেনের গার্ডকে বিষয়টি জানিয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিই।’ পরে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছানোর পর তারা চিকিৎসকের কাছে যান।
এক বছরে ২৭ বার পাথর নিক্ষেপ
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ যেন নিত্যদিনের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেলওয়ের তথ্য বলছে, গত বছরের মে থেকে চলতি বছরের এপ্রিল—এই এক বছরে কক্সবাজার রেলপথে অন্তত ২৭ বার চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১২ জন যাত্রী আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের রামু, ইসলামাবাদ ও ডুলাহাজারা এলাকায় পাথর ছোড়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’কে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে।
অনেক যাত্রীই সড়কপথের চেয়ে ট্রেনযাত্রাকে নিরাপদ ও আরামদায়ক মনে করেন। কিন্তু নতুন এই রেলপথে বারবার পাথর ছোড়ার ঘটনায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন পেশাগত কারণে নিয়মিত ‘সৈকত এক্সপ্রেস’ ও ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে যাতায়াত করেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তার চোখের সামনেই সৈকত এক্সপ্রেসের জানালার কাচে পাথর এসে লাগে।
সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রায়হান বলেন, ‘আমরা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। সেদিন যদি জানালা খোলা থাকত, তাহলে পাথর লেগে আমিও মারাত্মক আহত হতে পারতাম।’
কারা ছুড়ছে পাথর
রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, রেললাইন নির্মাণের সময় যারা জমি হারিয়েছেন বা লাইনের খুব কাছাকাছি যারা বসবাস করেন, তাদের ক্ষোভ বা হতাশা থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় স্রেফ আনন্দের বশবর্তী হয়ে এলাকার কিশোরেরা পাথর ছুড়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের উপপ্রধান পরিচালন তত্ত্বাবধায়ক তারেক ইমরান বলেন, ‘এই রুটে পাথর নিক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠাচ্ছি।’
যাত্রীদের আহত হওয়ার পাশাপাশি রেলের সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। গত এক বছরে পাথর ছোড়ার কারণে ট্রেনের অন্তত ১০টি জানালা ভেঙেছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, ‘আমরা রেলওয়ে পুলিশকে আরও তৎপর হতে বলেছি। পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার কাজ চলছে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও ইউএনওদেরও সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।’
তবে ২৪ ঘণ্টা রেলপথ পাহারা দেওয়ার মতো জনবল রেলওয়ের নেই। পাথর ছোড়াকে একটি ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ঠেকাতে সামাজিক উদ্যোগের বিকল্প নেই।’