২ বছর পর মিলল অজ্ঞাত লাশের পরিচয়, খুনি নিজের ছেলে
চট্টগ্রামে দুই বছর আগে উদ্ধার হওয়া এক অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। থানা পুলিশ ওই মামলার কোনো কূলকিনারা না পেয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। অবশেষে তদন্তে জানা গেছে, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে নিজের আপন ছেলে শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে তার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
এই ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার বাবুর্চি মীর মজিবুর রহমানের ছেলে বেলাল হোসেন (৩৫) এবং তার ভায়রা (স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী) আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। গতকাল রোববার আদালতে হাজির করা হলে ছেলে বেলাল নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই চট্টগ্রামের পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, হালিশহর থানা পুলিশ লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। তবে ভুক্তভোগীর মেয়ের দেওয়া একটি সূত্র এবং নিখোঁজ ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ করে আমরা প্রথমে ভিক্টিমের পরিচয় নিশ্চিত করি।
তিনি আরও বলেন, সম্পত্তির লোভে খুন করে লাশ ফেলে দিয়ে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রযুক্তিগত আলামত বিশ্লেষণ করে এই হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে সক্ষম হই।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ জুন হালিশহর থানার সিডিএ আউটার রিং রোড এলাকার একটি ঝোপ থেকে পচন ধরা অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরনে ছিল সাদা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি এবং গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। পরের দিন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশ নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
দীর্ঘ তদন্তেও কোনো সূত্র না পেয়ে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি হালিশহর থানা পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে ভুক্তভোগীর পরিচয় এবং খুনের উদ্দেশ্য ‘অজ্ঞাত’ রয়ে যায়।
এদিকে পিতা মীর মজিবুর রহমান খানের কোনো খোঁজ না পেয়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে সালমা বেগম কোতোয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের হাতে গেলে তদন্তে নতুন মোড় নেয়।
পিবিআই কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মজিবুর রহমান মূলত বাঁশখালীর বাসিন্দা ছিলেন এবং তিনি দুটি বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ জোগাতে মজিবুর কিছু সম্পত্তি বিক্রি করেছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন প্রথম পক্ষের ছেলে বেলাল হোসেন। বাবা যেন আর কোনো সম্পত্তি বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জুন এক নারীর মাধ্যমে ফাঁদ পেতে মজিবুর রহমানকে নগরীর কোতোয়ালী এলাকা থেকে বাকলিয়ার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়। এরপর বেলাল ও তার আত্মীয় আব্দুল জলিল একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে অচেতন মজিবুরকে প্রথমে সিআরবি এলাকায় নিয়ে যান। পরে বেলাল নিজে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে এনে তার বাবাকে হালিশহর এলাকায় নিয়ে যান এবং গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় লাশটি রাস্তার পাশের জঙ্গলে ফেলে তারা পালিয়ে যান।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ১৩ জুন বেলাল হোসেনকে এবং পরদিন আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে দুজনেই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পরে হালিশহর থানার মামলার ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, থানা পুলিশের তদন্তে যেসব সূত্র অমীমাংসিত ছিল, সেগুলো পুনঃবিশ্লেষণ করেই এই সফলতা এসেছে। এই হত্যাকাণ্ডে সহায়তাকারী পলাতক সেই নারীকে গ্রেপ্তারে পিবিআইয়ের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।