ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু: ইশতিয়াককে আটকের ভিডিওতে যা দেখা গেল

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর

ফরিদপুরের মধুখালীতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মারা যাওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে (২৭) আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফেসবুকে প্রচার হতে শুরু করে।

মির্জা ইশতিয়াক ওরফে প্রান্ত মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি মৃত এসকেন হায়দারের ছেলে এবং ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।

পরিবারের দাবি, আটকের পরদিন ডিবির নির্যাতনে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে এবং হেফাজতে তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে নিজ বাড়ির সামনে লুঙ্গি পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন ইশতিয়াক। তার কাঁধে একটি ল্যাপটপ ব্যাগ ছিল। ভিডিওতে তাকে ঘিরে আরও তিনজনকে দেখা যায়। তারা ডিবি পুলিশ দলের সদস্য এবং ওইদিন এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। 

ওই তিন ব্যক্তির মধ্যে একজন লাল রঙের টি-শার্ট পরা ডিবি সদস্য। তিনি প্রথমে ইশতিয়াকের গতি রোধ করেন, ঠেলা ধাক্কা দেন এবং কিছু বলার চেষ্টা করেন। এসময় সাদা টি-শার্ট পরা আরেক ব্যক্তি এসে ইশতিয়াকের কোমর ধরে তাকে কিছু বলতে দেখা যায়।

ভিডিওর ১৪ সেকেন্ডে ইশতিয়াককে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওর ৩৬ সেকেন্ডে একটি গালি দিয়ে ইশতিয়াকের মাথায় হাত দিয়ে আঘাত করেন সাদা রঙের টি-শার্ট পরা ডিবি সদস্য। ওই সময় লাল রঙের টি-শার্ট পরা সদস্য তাকে বাধা দিয়ে বলেন, ‌‌‌‘মারিস না।’

এসময় ওই এলাকায় ক্রিম রঙের প্যান্ট ও অ্যাশ রঙের চেক শার্ট পরা এক ব্যক্তি ভিডিওতে যুক্ত হন। ৪৩ সেকেন্ডে তাকে মোবাইল ফোনে বার বার বলতে শোনা যায়, ‘লাঠি নিয়ে মরিচ বাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন দ্রুত।’ এরপর তিনিও তল্লাশিতে অংশ নেন।

ভিডিওর ১ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে ইশতিয়াককে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং তাকে তল্লাশি করতে দেখা যায়।

মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে একটি রূপালি রঙের মাইক্রোবাস এসে থামে। সেখান থেকে নারী সদস্যসহ আরও কয়েকজন অভিযানে যোগ দেন।

ভিডিওর ২ মিনিট ৭ সেকেন্ডে ইশতিয়াকের কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে বাম দিকে কিছু একটা দেখে অ্যাশ রঙের শার্ট পরা ব্যক্তি চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘এই যে এক টোপলা, এই যে’। 

তবে ভিডিওতে দেখা যায়, ওই বস্তুটি ইশতিয়াককে তল্লাশির স্থান থেকে কিছুটা দূরে ছিল। তখন সঙ্গের অন্য ডিবি সদস্যদেরও ‘এই যে’, ‘এই যে’ বলতে শোনা যায়। 

গত ২১ জুন বিকেল ৫টার দিকে ইশতিয়াককে আটক করে ডিবি। পরিবারের অভিযোগ, আটকের সময় তার মায়ের সামনেই তাকে মারধর করা হয়। ডিবির হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুন রবিবার সকাল ৮টার দিকে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়।

ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তার গত বৃহস্পতিবার ওইদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ডিবি সদস্যরা ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার ছেলেকে নারী সদস্য দিয়ে তল্লাশি করান। পরে ঘর তল্লাশি শেষে ইশতিয়াককে সঙ্গে নিয়ে চলে যান।

তিনি দাবি করেন, ওই রাতেই ৬৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ইশতিয়াককে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তার আত্মীয় সোহেল মুন্সীর সঙ্গে ডিবি সদস্যদের কথা হয়েছিল। পরে ডিবি জানায়, এই ছেলে কলেজে পড়ে, ছাত্রলীগ করে, আজ তাকে ছাড়া হবে না। কাল সকালে এক লাখ টাকা দিয়ে ফরিদপুর আসেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে খাদিজা আক্তার বলেন, `সকালে আমি এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাই। ছেলে অসুস্থ হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে শুনে আমি হাসপাতালে যাই। গিয়ে আমি আমার ছেলের লাশ পাই। আমার জীবিত ছেলেকে নিয়ে গেল আমার সামনে, এলাকা থেকে, প্রতিবেশীদের সামনে। এইখানে আনার পর জীবিত ছেলের মৃত লাশ পেলাম।'

ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে ইশতিয়াকের মা বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’

তবে ডিবি পুলিশের দাবি, ওই যুবককে নির্যাতন করা হয়নি। ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর রোববার (২১ জুন) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, গোয়েন্দা শাখা মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে তার বাড়ি থেকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ বোধ করেন। তাৎক্ষণিক তাকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ইশতিয়াকের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি যে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে তার শরীরে কোনো ধরনের জখমের চিহ্ন ছিল না। পুলিশের হেফাজতে তাকে কোনো ধরনের আঘাত বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি।

এই ঘটনাকে 'হত্যাকাণ্ড' আখ্যা দিয়ে মধুখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া বলেন, ‘পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’

এদিকে, নিহত ইশতিয়াককে নিজেদের 'একনিষ্ঠ কর্মী' উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেছে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগ।