জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় বিএনপি-জোটের সম্পৃক্ততা বেশি: অধিকার
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত নির্বাচনী সহিংসতার সঙ্গে বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি ছিল বলে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে সংঘটিত সহিংসতার ৫২ শতাংশ, নির্বাচনের দিন ৫৩ শতাংশ এবং নির্বাচনের পর ৭৫ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে বিএনপি ও তাদের জোটের সম্পৃক্ততা ছিল।
অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে সংঘটিত ঘটনার ১৫ শতাংশ, নির্বাচনের দিন ১৩ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ের ৯ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত ও তাদের জোটের সম্পৃক্ততা ছিল।
আজ সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে অধিকার আয়োজিত অংশীজন সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
জাতীয় নির্বাচনে ২২ জেলার ৫০টি আসনে ৫০ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছিল অধিকার। নির্বাচনের দিন ৪৮০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে ছিলেন আরও ৫০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক।
নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপনের সময় সংগঠনটির প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর কোরবান আলী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্রচার, ভোটগ্রহণ ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা অব্যাহত ছিল।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ভোলা, ময়মনসিংহ ও ঢাকাকে সহিংসতার প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি ছিল সহিংসতার সবচেয়ে সাধারণ ধরন। তবে নির্বাচনের পর শারীরিক হামলা, সম্পদহানি ও প্রাণহানির ঘটনা আরও বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।
জনসমাগমের স্থান, ব্যক্তিগত বাসাবাড়ি, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, বাজার, স্কুল, উপাসনালয় ও ভোটকেন্দ্রে এসব ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনের আগে
নির্বাচনের আগে জেলাভিত্তিক তথ্যে ৬২টি সহিংসতার ঘটনা পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১টি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। এরপর কক্সবাজারে আটটি, ঢাকা ও ময়মনসিংহে পাঁচটি করে ও সিরাজগঞ্জে চারটি ঘটনা ঘটেছে।
সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২১টি ঘটনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মোট ঘটনার ৪৯ শতাংশ। আরও ১৫টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ ক্ষেত্রে, অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সাতটি ঘটনায় এর প্রভাব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
নির্বাচনের আগের ৩৪টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোনো না কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ২৮টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনের দিন
নির্বাচনের দিন ১৯টি আসনে ৩২টি সহিংসতার ঘটনার কথা বলা হয়েছে অধিকার-এর প্রতিবেদনে।
ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি সাতটি এবং ভোলায় ছয়টি ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে চারটি এবং কক্সবাজার ও ফেনীতে তিনটি করে ঘটনা ঘটেছে।
৩২টি ঘটনার মধ্যে ১৭টির, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশের সঙ্গে বিএনপি-জোটের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। জামায়াত-জোটের সম্পৃক্ততা ছিল চারটি ঘটনায়, যা মোটের ১৩ শতাংশ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে দুটি ঘটনায়।
নির্বাচনের দিন ১৪টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে জনতা ছত্রভঙ্গ করা ও আটক করার মতো পদক্ষেপ ছিল। ১১টি ঘটনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও সাতটি ঘটনায় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনের পর
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেগুলো ছিল বেশি গুরুতর।
তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে একজনের প্রাণহানি ঘটলেও নির্বাচনের পর প্রাণহানি হয়েছে পাঁচজনের।
গুরুতর আহতের সংখ্যা নির্বাচনপূর্ব সময়ে ১৩ থেকে বেড়ে নির্বাচনের পর ২০ হয়েছে। একইভাবে সামান্য আহতের ঘটনা ১৫ থেকে বেড়ে ৩০ এবং সম্পদহানির ঘটনা সাত থেকে বেড়ে ১১ হয়েছে।
তবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ১৬টি থেকে কমে ছয়টিতে নেমেছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দলীয়ভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জোটের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে ৩২টি ঘটনায়, যা মোটের ৭৫ শতাংশ।
জামায়াত-জোটের সম্পৃক্ততা ছিল চারটি ঘটনায়, অর্থাৎ ৯ শতাংশ।
নির্বাচনের পর ১৭টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৪১ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আরও আটটি ঘটনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চিত করতে পারেননি।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোও মূলত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ছিল। নথিবদ্ধ ৩৯টি ব্যবস্থার মধ্যে ৩৪টিই ছিল নিরাপত্তা জোরদার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিএনপির যেসব নেতা অনিয়ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেতাদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডে সহিংস মনোভাব না থাকলে পরিবর্তন আসতে পারে। সমালোচনা ও আলোচনা থাকবে, তবে তা গঠনমূলক হতে হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘দলের ভেতরে দুর্বল গণতন্ত্র শাসনব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতা ভোটার উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা উচিত।’
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, মারদিয়া মমতাজসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।