১৩ বছরেও হয়নি ত্বকী হত্যার বিচার, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় পরিবার

সৌরভ হোসেন সিয়াম
সৌরভ হোসেন সিয়াম

গত ১৩ বছরে দেশে তিনবার সরকার গঠিত হয়েছে। ন্যায়বিচারের আশ্বাসও এসেছে বারবার। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও তদন্ত শেষ করে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচারকাজ শুরু করা যায়নি। 

২০১৩ সালের এইদিনে (৮ মার্চ) শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর দুই দিন আগে ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপহৃত হয় সে।

গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ছয় আসামিকে নতুন করে গ্রেপ্তার করা হলে মামলাটির তদন্তে কিছুটা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সেই গতি আবার থেমে যায়। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তাদের আশা, সদ্যনির্বাচিত বিএনপি সরকার চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং দ্রুত বিচারকাজ শুরু করবে।

ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, কবে নাগাদ তারা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেবেন।

যদিও গত ৮ জানুয়ারি মামলার শততম শুনানিতে বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত র‍্যাবকে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ত্বীকর বাবা রফিউর রাব্বি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যদের জড়িত। এ কারণেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর এক মাসের ব্যবধানে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলে ন্যায়বিচারের আশা জাগে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ওসমান পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু অন্তর্বর্তী
সরকার কাকে রক্ষা করতে চেয়েছে, জানি না। কিন্তু বিচারটা হয়নি।

‘সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ করতে তাগিদ দেওয়ার পরও সংস্থাগুলো কেন তা সম্পন্ন করেনি, তা এখনো একটি প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।’

রফিউর রাব্বি বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছেও আমরা ন্যায়বিচার আশা করছি।

এদিকে, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচারকাজ শুরু করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক।

অন্যদিকে, ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৩ বছর পূর্তিতে ৬, ৮ ও ১৪ মার্চ তিন দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসা থেকে বেরিয়ে স্থানীয় একটি পাঠাগারের সামনে থেকে অপহরণ হয় ১৭ বছর বয়সী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। পরদিন তার ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। যেখানে দেখা যায় ত্বকী পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ২৯৭ পেয়েছিলেন।

তবে, অসাধারণ এই ফলাফল জানতে পারেনি ত্বকী। ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে অনন্য মেধাবী এই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ত্বকী হত্যার বর্ষপূর্তির একদিন আগে ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানিয়েছিল, এই হত্যা মামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন তারা। যেকোনো দিন আদালতে জমা পড়বে অভিযোগপত্র।

কিন্তু গত ১২ বছরেও সেই ‘যেকোনো দিন’ আর আসেনি।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটি খানিকটা গতি পায়। র‌্যাব সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। সংস্থাটি জানায়, তারা সবাই আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠজন।

আজমেরী ওসমান প্রয়াত সংসদ সদস্য এ কে এম নাসিম ওসমানের ছেলে ও শামীম ওসমানের ভাতিজা।

গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আজমেরীর সহযোগী কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আজমেরীর গাড়িচালক মো. জামশেদ, আত্মীয় আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ‘জামাই মামুন’, সহযোগী শাফায়েত হোসেন শিপন, মামুন মিয়া ও ইয়ার মোহাম্মদ এ মামলায় গ্রেপ্তার হলেও পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন।

ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে আলাপকালে তৎকালীন র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা বলেছিলেন, ‘প্রচ্ছন্ন চাপে’ অনেক বছর আটকে থাকলেও তারা এখন মামলাটির তদন্ত দ্রুত শেষ করতে চান। তিন মাসের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও সম্ভব হয়নি।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এই হত্যা মামলার নথিপত্র ১০১ বারের মতো আদালতে উঠেছে। কিন্তু অভিযোগপত্র জমা পড়েনি। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার মামলাটির শেষ শুনানি হয়েছে।

ইতোমধ্যে তদন্তকারী সংস্থাটির অধিনায়ক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুজনই বদলি হয়েছেন।

র‌্যাব-১১ এর বর্তমান অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের তদন্ত চলমান। তদন্ত শেষ হলে সিস্টেম অনুযায়ী আদালতে প্রতিবেদনও দাখিল করা হবে।’

তবে তদন্ত শেষ করতে আরও কতদিন লাগতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি এ কর্মকর্তা।

ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে এখনো আশাবাদী ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, বিএনপি সরকার অন্তত বিচার বন্ধ রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ত্বকী হত্যার বিচারকাজ শুরু করবে।’

২০১৩ সালের ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

ওই বছরের ১৮ মার্চ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ‘ক্যাঙারু পারভেজ’, বর্তমানে নিষিদ্ধ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমানসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে  অভিযোগ জমা দেন।

পরে রফিউর রাব্বির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করে।

ত্বকী হত্যার কয়েক মাসের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইউসুফ হোসেন লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর, তায়েবউদ্দিন জ্যাকি, রিফাত বিন ওসমান ও সালেহ রহমান সীমান্ত। সবাই পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর লিটন ও ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা থেকে হত্যা পর্যন্ত সব ঘটনার বিবরণও দিয়েছিলেন।

ত্বকীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর কয়েকদিন আগে র‌্যাব জানিয়েছিল, তারা হত্যার রহস্য ভেদ করেছে ও এমনকি একটি খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের মার্চে আজমেরী ওসমানসহ ১১ জনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা র‌্যাবের খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়।

সে সময় র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাদের কাছে ১১ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র যেকোনো দিন আদালতে জমা দেওয়া হবে।

এরপর ওই বছরের জুনে সংসদে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ওসমান পরিবারের পাশে’ থাকার ঘোষণা দেন। এরপরই ত্বকী হত্যা মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ পরিবারের।

র‌্যাবের ফাঁস হওয়া তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্বকী হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সরাসরি হত্যাকাণ্ডেও অংশ নিয়েছিলেন আজমেরী। তার নির্দেশে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ তার সহযোগীরা ত্বকীকে অপহরণ করে শহরের আল্লামা ইকবাল রোডে উইনার ফ্যাশনের ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে যায়।

ওই রাতেই আজমেরী ও তার সহযোগীরা ত্বকীকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর ত্বকীর মরদেহ বস্তায় ভরে আজমেরীর গাড়িতে করে চারারগোপ এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে রাত ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে নৌকায় করে মরদেহ নিয়ে কুমুদিনী জোড়াখাল এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। পরদিন ৮ মার্চ নদী থেকে ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে রফিউর রাব্বি তার সমর্থকদের নিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালান। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারেন শামীম ওসমান।

২০১৩ সালের ৭ আগস্ট আজমেরীর ‘উইনার ফ্যাশন’ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে রক্তমাখা জিন্স, পিস্তলের বাট ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করে র‌্যাব। দেয়াল, সোফা ও আলমারিতে বেশকিছু গুলির চিহ্নও দেখতে পান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

ফাঁস হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ত্বকী হত্যায় ১১ জন অভিযুক্তের প্রত্যেকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

আজমেরী ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন—ইউসুফ হোসেন লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর, তায়েবউদ্দিন জ্যাকি, রাজীব, কালাম শিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপন ও জামশেদ হোসেন।

অভিযুক্ত লিটন, ভ্রমর, জ্যাকি ও সন্দেহভাজন হিসেবে রিফাত বিন ওসমান ও সালেহ রহমান সীমান্তকে গ্রেপ্তারও করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে সবাই জামিনে বেরিয়ে আসেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই বছরের জুলাই ও নভেম্বর মাসে যথাক্রমে লিটন ও ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা থেকে হত্যা পর্যন্ত সব ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। যদিও পরে ভ্রমর আদালতে জবানবন্দিতে তার দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারেরও আবেদন জানিয়েছিলেন।